সুন্দরবনে বনদস্যু আতঙ্ক, ঋণের বোঝা নিয়েই প্রবেশের প্রস্তুতি বনজীবীদের

 প্রকাশ: ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২০ অপরাহ্ন   |   রংপুর

সুন্দরবনে বনদস্যু আতঙ্ক, ঋণের বোঝা নিয়েই প্রবেশের প্রস্তুতি বনজীবীদের

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি :

দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। জীবিকার আশায় সুন্দরবনমুখী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের জেলে-বাওয়ালী ও বনজীবীরা। তবে দীর্ঘদিন পর বনে যাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি তাদের মনে রয়েছে বনদস্যু আতঙ্ক। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বনে গিয়ে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করে সংসার চালানো ও ধারদেনা পরিশোধের স্বপ্ন দেখলেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মাছের প্রজনন মৌসুমকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বন বিভাগ। এ সময়ে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, গোলপাতা ও মধু সংগ্রহের পাশাপাশি পর্যটকদের প্রবেশও বন্ধ থাকে। নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হওয়ায় আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবনের প্রবেশপথগুলো আবারও খুলে দেওয়া হবে।

এদিকে সুন্দরবন বন্ধ থাকায় গত তিন মাস চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটিয়েছেন বনজীবীরা। অনেকেই সংসারের খরচ চালাতে ঋণ করেছেন। এখন সেই ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি নৌকা, জাল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মেরামতের জন্য আবারও ধারদেনা করতে হচ্ছে তাদের।

শ্যামনগর উপকূলের জেলে আয়ুব আলী, ইসমাইল হোসেন, সুবোল মুন্ডাসহ কয়েকজন বলেন, তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ থাকায় খুব কষ্টে সংসার চালাতে হয়েছে। সুদে টাকা নিয়ে সংসারের খরচ মেটাতে হয়েছে। এখন আবার সুদে টাকা নিয়ে নৌকা ও জাল মেরামত করছি। ১ সেপ্টেম্বর বন খুললে মাছ-কাঁকড়া ধরে ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া, বাবা-মায়ের ওষুধ ও সংসারের খরচ চালাতে হবে।

তবে বনে প্রবেশের আগে তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বনদস্যু আতঙ্ক। জেলেদের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি বনদস্যু দল সক্রিয় রয়েছে। ফলে বনে গিয়ে উপার্জন করা অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ ও সংসার চালাবেন, নাকি বনদস্যুদের চাঁদা দেবেন, তা নিয়েই শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

স্থানীয় একাধিক জেলে জানান, এর আগেও সুন্দরবনে প্রবেশের সময় বনদস্যুদের চাঁদা দিয়ে কথিত ‘স্লিপ’ নিয়ে বনে যেতে হয়েছে। বনদস্যু নির্মূলে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস দেওয়া হলেও তাদের দাবি, কার্যকর অভিযান ও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি।

শুধু জেলে-বাওয়ালীরাই নন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহকারী অন্যান্য মানুষও তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। নীলডুমুর ট্রলার মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম বলেন, সাতক্ষীরা রেঞ্জের সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটক পরিবহনে পাঁচ শতাধিক ট্রলার চলাচল করে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাছ-কাঁকড়া আহরণের পাশাপাশি পর্যটকদের প্রবেশও বন্ধ থাকে। ফলে এ সময়ে ট্রলারচালক ও শ্রমিকদের বেকার থাকতে হয়। ধারদেনা করে তাদের সংসার চালাতে হয়।

অন্যদিকে, সুন্দরবনের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে সবসময়ই বন্ধ থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় জেলেরা। তাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময়ে অসাধু জেলেরা অভয়ারণ্য এলাকায় ঢুকে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার ও ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে। এতে প্রকৃত বনজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অসাধু চক্রের তৎপরতা বন্ধ হচ্ছে না।

জেলেদের দাবি, সুন্দরবনের অন্তত ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ম মেনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য উন্মুক্ত করা হলে অসাধু জেলেদের বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও হরিণ শিকারের প্রবণতা কমতে পারে।

এদিকে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়ম মেনে জেলে-বাওয়ালী ও পর্যটকবাহী ট্রলারকে সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য পাস দেওয়া হবে। সুন্দরবনে প্রবেশকারীদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় নির্ধারিত নিয়ম-কানুন মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান বলেন, সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, এটি মৎস্যসম্পদেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ফরেস্ট স্টেশনগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।