সংবাদ শিরোনাম

মৃতপ্রায় ভৈরব: নাব্যতা সংকটে হুমকিতে নওয়াপাড়া বন্দর ও দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্য

 প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪১ অপরাহ্ন   |   খুলনা

মৃতপ্রায় ভৈরব: নাব্যতা সংকটে হুমকিতে নওয়াপাড়া বন্দর ও দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্য

খুলনা ব্যুরো :

এক সময়ের প্রমত্তা ভৈরব নদ আজ নাব্যতা সংকটে ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার প্রাণশক্তি। যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ার বুক চিরে বয়ে যাওয়া এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্র নওয়াপাড়া। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং নদী রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের অভাবে এখন সেই ভৈরব নদই হয়ে উঠেছে সংকটের কারণ। এর প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নওয়াপাড়া নৌবন্দরের ওপর।

নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম দিন দিন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। খাদ্যশস্য, কয়লা, সার, সিমেন্টসহ বিভিন্ন আমদানিকৃত পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ অনেক সময় ভাটার সময় বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে পণ্য খালাসে বিলম্ব, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নওয়াপাড়া নদী বন্দরের ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় প্রায় অর্ধ কিলোমিটারজুড়ে নদীর বড় একটি অংশ চর পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। নদীর বিভিন্ন স্থানে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় বড় জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর ফলে মাঝেমধ্যে কার্গো জাহাজ আটকে যাওয়া কিংবা দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বন্দরনির্ভর মানুষজন বলছেন, ভৈরব নদই নওয়াপাড়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। নদীর ওপর নির্ভর করেই এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য গুদাম, শিল্পকারখানা, পরিবহন ব্যবসা এবং শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান। নাব্যতা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে।

নওয়াপাড়া সার ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানান, নৌবন্দরটি রেলপথের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বছরে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার পণ্য এখানে আমদানি ও খালাস হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় এসব পণ্য সরবরাহ করা হয় নওয়াপাড়া থেকে। ফলে বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হলে শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, নিয়মিত ড্রেজিং ও নদী সংস্কারের অভাবে ভৈরব নদে পলি জমে নাব্যতা দ্রুত কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নদীর বিভিন্ন স্থানে বেআইনি দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নওয়াপাড়া বন্দরের কর্মকর্তারা জানান, শুকনো মৌসুমে নাব্যতার সংকট মোকাবিলায় বিআইডব্লিউটিএ চারটি ড্রেজিং মেশিন দিয়ে নদী খননের কাজ পরিচালনা করেছে এবং যেখানে সমস্যা বেশি সেখানে ড্রেজিং অব্যাহত রয়েছে।

তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্থায়ী ড্রেজিং দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ভৈরব নদকে বাঁচাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। নিয়মিত ড্রেজিং, নদীর দখলমুক্তকরণ, খাল ও উপনদী পুনরুদ্ধার এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

নওয়াপাড়া বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। কারণ ভৈরব নদ শুধু একটি নদী নয়—এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প, বাণিজ্য ও হাজারো মানুষের জীবিকার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদীটির প্রাণ ফিরে না এলে নওয়াপাড়ার অর্থনীতির গতিও ধীরে ধীরে থমকে যেতে পারে।