নয় বছরেও ফেরার পথ খোলেনি; স্বদেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা
বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রেক্ষাপটে আবারও সামনে এসেছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত জীবন। প্রতিবছর ২০ জুন বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হলেও, বাংলাদেশে আশ্রিত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জন্য সেই প্রত্যাশা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর সহিংস অভিযান, দমন-পীড়ন ও গণহত্যার মুখে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের যুক্ত করলে বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী।
প্রায় নয় বছর ধরে শরণার্থী শিবিরের সীমাবদ্ধ পরিবেশেই কাটছে তাদের জীবন। বাঁশ ও ত্রিপলে নির্মিত অস্থায়ী আশ্রয়, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন তারা।
রোহিঙ্গা শরণার্থী জাহেদ হোসাইন বলেন, “আমরা আমাদের মৌলিক অধিকার ফিরে পেতে চাই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান, যেন মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়।”
একই প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে আরেক শরণার্থী মোহাম্মদ জোবাইর বলেন, “বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। তবে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিজ দেশে ফিরে যাওয়া, যদি সেখানে নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়।”
বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে বহু দফা উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত টেকসই প্রত্যাবাসন কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং পারস্পরিক আস্থার সংকটই এ প্রক্রিয়ার প্রধান বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উখিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সরওয়ার জাহান চৌধুরীর মতে, দীর্ঘস্থায়ী এ সংকট শুধু মানবিক ইস্যু নয়, এটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “কর্মসংস্থান, পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।”
স্থানীয় অধিকারকর্মী রবিউল হুসাইন বলেন, “দীর্ঘ নয় বছরেও একজন রোহিঙ্গার স্থায়ী ও টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে একটি সুস্পষ্ট রোহিঙ্গা নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও মনে করছেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হলে সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। তাদের মতে, প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত শরণার্থী শিবিরগুলোতে নিয়ন্ত্রিত পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অস্থিরতা কমানো সম্ভব।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের নির্ধারিত এলাকায় রেখে কার্যকর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে সামাজিক অস্থিরতা কমবে।”
বিশ্ব শরণার্থী দিবসে রোহিঙ্গা শিবিরগুলো থেকে তাই একটিই বার্তা উচ্চারিত হচ্ছে—নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে নিজ ভূমিতে সম্মানের সঙ্গে ফিরে যাওয়ার সুযোগ।
তবে বাস্তবতা হলো, প্রায় এক দশক পার হলেও সেই প্রত্যাবর্তনের পথ এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর, দৃশ্যমান এবং সমন্বিত উদ্যোগের প্রত্যাশায় রয়েছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে স্বদেশে ফেরার আশায় প্রহর গুনছেন ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।