সংবাদ শিরোনাম

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই: সোহরাওয়ার্দী কলেজের অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক

 প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ০৭:১৪ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই: সোহরাওয়ার্দী কলেজের অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক

মহানগর ডেস্ক:

​চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। এই সনদ নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর অবকাশ নেই উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট জানান, জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই ঐতিহাসিক সনদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল এবং সনদে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পূরণে দলটি সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে জুলাই আদেশ নিয়ে বিএনপির কিছু অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য রয়েছে, যা কোনো গোপন বিষয় নয় এবং নির্বাচনের আগেই দলের পক্ষ থেকে তা দেশবাসীকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছিল।

​বুধবার (২০ মে) রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা-২০২৬ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দীর্ঘ দেড় দশকের পুঞ্জীভূত সমস্যা এবং শিক্ষাঙ্গনের উন্নয়নে সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা উঠে আসে তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যে। অনুষ্ঠানে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা এই তরুণ রাজনৈতিক নেতা কলেজের সামগ্রিক সংকট নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

​গণঅভ্যুত্থানে সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা স্মরণ করে ইশরাক হোসেন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ২০২৪ সালের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনে এই কলেজের দুই বীর শিক্ষার্থী নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই শহীদদের আত্মত্যাগ যেন হারিয়ে না যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে জুলাই আন্দোলনের মূল কারণ ও প্রেরণা সম্পর্কে জানতে পারে, সেজন্য কলেজের সামনে কিংবা মূল সড়কে একটি দৃষ্টিনন্দন ও মর্যাদাপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। এটি শুধু একটি স্থাপনা হবে না, বরং স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের চিরন্তন প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে।

​বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী কলেজের অবকাঠামোগত বেহাল দশা এবং বিগত সরকারের চরম অবহেলার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ঢাকার বুকে একটি অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও বিগত ১৭ বছর ধরে একে সম্পূর্ণ অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। ভবনের জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা এখন এতটাই প্রকট যে, কোথাও ফাটল বা বড় ক্ষতি হওয়ায় সাময়িকভাবে অস্থায়ী পিলার বসিয়ে তা টিকিয়ে রাখতে হয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার এই ঝুঁকি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

​শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কথা স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখানে তীব্র আবাসন সংকট রয়েছে, শিক্ষার্থীদের বসার মতো পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই এবং আধুনিক জ্ঞানচর্চার জন্য কোনো বিজ্ঞানাগার নেই। এই মৌলিক সমস্যাগুলো তাঁর জানা রয়েছে এবং এর স্থায়ী সমাধানের জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নেবেন। খুব শিগগিরই শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীকে সাথে নিয়ে এই কলেজ ক্যাম্পাস পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে এবং একটি সমন্বিত নতুন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়ে তা দ্রুত বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা হবে। আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বমানের জ্ঞান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে কলেজটিকে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।

​একই সাথে তিনি পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক সংলগ্ন এলাকার পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরের জঞ্জাল ও অনিয়ম একদিনে বা একমাসে দূর করা সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে এবং ধাপে ধাপে সবকিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করতে মাদক, কিশোর গ্যাং এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিতকারী যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শনের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে বা তার বাইরে যেকোনো ধরনের অপকর্ম প্রতিরোধে ছাত্রসংগঠনগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাকেও কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

​শিক্ষার্থীদের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই কলেজের জন্য একটি উন্নত মানের প্রজেক্টর দেওয়ার ঘোষণা দেন প্রতিমন্ত্রী। এই উদ্যোগ সফল করতে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্যের সঙ্গে যৌথভাবে অর্থায়নের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি কলেজের সম্মানিত শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আগামী বাজেটে যেন কলেজের মূল সমস্যাগুলো সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়, সেজন্য সব সংকট চিহ্নিত করে একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে। আসন্ন ঈদের ছুটির পর শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শুধু সোহরাওয়ার্দী কলেজই নয়, বরং আশপাশের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও পরিদর্শনের মাধ্যমে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

​নতুন অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচিত সরকারের সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের কথা অকপটে স্বীকার করে ইশরাক হোসেন বলেন, সরকার গঠনের মাত্র ৯২ দিনের মধ্যে দীর্ঘ দেড় দশকের সব সমস্যার সমাধান করা অলৌকিক বিষয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যেভাবে অনিয়ম, গভীর দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট চালানো হয়েছে, তাতে একটি অত্যন্ত জটিল ও ভঙ্গুর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে সবকিছু পুনর্গঠন করতে হচ্ছে বলেই অনেক ভালো ও জরুরি উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। তবে জনগণের ধৈর্য ও সহযোগিতায় এই অচলাবস্থা কেটে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

​সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের বার্ষিক এই সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডক্টর খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কাকলী মুখোপাধ্যায় এবং সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ফরিদা ইয়াসমিন। এছাড়া অফিসার্স কাউন্সিলের সম্পাদক, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকমণ্ডলী, বিপুল সংখ্যক সাধারণ শিক্ষার্থী এবং ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলেন।