জবাবদিহিতাহীন নিরাপত্তা বিশ্ব শান্তির প্রধান অন্তরায়: বিইউপির আন্তর্জাতিক সম্মেলনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন
মহানগর ডেস্ক:
পরিবর্তিত ও প্রতিনিয়ত রূপান্তরশীল বিশ্বব্যবস্থায় জবাবদিহিতাবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা কখনো টেকসই স্থিতিশীলতা ও শান্তি আনতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। বর্তমান ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, কেবল শক্তির জোরে চাপিয়ে দেওয়া নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল বয়ে আনে না, বরং তা বৈশ্বিক সুশাসনকে বাধাগ্রস্ত করে। বুধবার (২০ মে) রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে অবস্থিত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) সেন্টার ফর ফিউচার স্টাডিজ (সিএফএস) আয়োজিত দুদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী সেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আধুনিক বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিরাপত্তার সংজ্ঞা যে আমূল বদলে গেছে, সে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্পিকারের বক্তব্যে উঠে আসে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিরাপত্তা এখন আর কেবল কোনো দেশের সীমানা রক্ষা বা সামরিক শক্তির প্রদর্শনী কিংবা অভ্যন্তরীণ পেশী শক্তির ওপর নির্ভর করে না। বরং একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সরাসরি যুক্ত থাকে সেই জাতির অর্জিত জ্ঞান, সম্মিলিত প্রজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক সীমানার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর। স্পিকার বিশ্বাস করেন, আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়ে যে নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি হয়, সেটাই প্রকৃত অর্থে বিশ্বকে একটি নিরাপদ বাসযোগ্য স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক বিস্তারের প্রসঙ্গ টেনে জাতীয় সংসদের স্পিকার নতুন নেতৃত্ব তৈরির ওপর বিশেষভাবে জোর দেন। তিনি মনে করেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়ে যদি আমরা তরুণ প্রজন্মকে যুগের উপযোগী করে গড়ে তুলতে না পারি, তবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। প্রযুক্তির এই ক্রমবর্ধমান বিস্তারের যুগে আমাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো আগামী দিনের যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্ব তৈরিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা। এই বিনিয়োগ একদিকে যেমন জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্বশীলতাকে বিশ্বের দরবারে প্রমাণ করবে, অন্যদিকে দেশের সাধারণ জনগণের আস্থা ও ভরসাকে আরও বেশি সুদৃঢ় ও সুসংহত করবে। তরুণদের হাত ধরেই রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দুদিনব্যাপী আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে অত্যন্ত গভীর ও তাত্ত্বিক আলোচনা পরিবেশিত হয়। সমাপনী সেশনে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সাইবার নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির মতো সমসাময়িক নানা সংকট নিয়ে মতবিনিময় ও গবেষণাভিত্তিক গঠনমূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই সেশনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ ও গবেষকগণ মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে নেপালের ড. প্রমোদ জয়সওয়াল, শ্রীলঙ্কার সুভাশিনি আবেয়াসিংহে, পাকিস্তানের ড. সালমা মালিক এবং সুইডেনের ড. গ্রেগ সিমন্স নিজ নিজ দেশের ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে মূল্যবান প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। আন্তর্জাতিক এই থিংক-ট্যাংক ও গবেষকদের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের সমাধান একক কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন বহুপাক্ষিক অংশীদারিত্ব।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল আলম। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দেশী-বিদেশী আমন্ত্রিত শিক্ষক, গবেষক এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এই সমাপনী সেশনে অংশগ্রহণ করেন। উপস্থিত সুধীজন ও গবেষকগণ স্পিকারের বক্তব্যের সাথে একাত্মতা পোষণ করে বলেন, শিক্ষার আলো এবং জবাবদিহিতামূলক সমাজ গঠনই পারে আধুনিক বিশ্বের যাবতীয় অস্থিতিশীলতা দূর করতে। বর্ণাঢ্য ও প্রাণবন্ত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী সেশনটি বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণে তরুণদের ভূমিকা এবং গবেষণার গুরুত্বকে আরও একবার নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।