রক্তস্নাত জুলাইয়ের স্মৃতিগাথা: ইতিহাসের বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘর’
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
সকালটা ছিল মঙ্গলবার, ১২ মে। ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০২৬ সাল। ঢাকার আকাশ জুড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি থাকলেও গণভবন সংলগ্ন নবনির্মিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘর’ প্রাঙ্গণে তখন এক গম্ভীর শোকাতুর পরিবেশ। এক সময় যে ভবনটি ছিল ক্ষমতার দম্ভের কেন্দ্রবিন্দু, আজ সেটিই হয়ে উঠেছে জনগণের লড়াই আর ত্যাগের এক জীবন্ত মহাকাব্য।
স্মৃতির মিনারে স্পিকারের আবেগঘন শ্রদ্ধা
পরিদর্শন শেষে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সাংবাদিকদের বলেন, “এই জাদুঘর কেবল ইটের স্থাপনা নয়, এটি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জাতির অবিনাশী অনুপ্রেরণা। যতদিন এই জাদুঘর টিকে থাকবে, ততদিন এদেশের মানুষের লড়াইয়ের ইতিহাস অমলিন থাকবে।”
তিনি ক্ষোভের সাথে স্মরণ করিয়ে দেন গত ১৬ বছরের দুঃশাসনের কথা। স্পিকারের ভাষায়, “মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনা ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে যে নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, তার প্রতিটি ক্ষত এখানে মুন্সিয়ানার সাথে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।” গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সাথে শেখ হাসিনার সেই ‘মিথ্যা সমবেদনা’ ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে এখানে সংরক্ষিত আছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’: ফিরে দেখা ইতিহাস
স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী যখন ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি রোড’ দিয়ে হাঁটছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল তারা সময়ের উল্টো পিঠে ভ্রমণ করছেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৯১-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি মাইলফলকের স্থিরচিত্র তাদের চোখেমুখে সংগ্রামের স্মৃতি জাগিয়ে তুলছিল।
তবে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ২০২৪-এর জুলাই। দেয়ালে দেয়ালে জুলাই আন্দোলনের অমর কারিগর আবু সাঈদ, মুগ্ধ ও ওয়াসিমদের বীরত্বগাথা। শহিদ আনাসের কবিতার লাইনগুলো যেন দেয়ালে নয়, দর্শকদের হৃদয়ে বিঁধছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোর প্রতিটি নথি ও গ্রাফিতি অত্যন্ত যত্নে সাজানো হয়েছে এই জাদুঘরে।
অশ্রুভেজা আয়নাঘর ও রক্তমাখা জামা
পরিদর্শনের এক পর্যায়ে সংসদীয় দলটি যখন ‘আয়নাঘর’-এর মিনিয়েচার এবং ‘মেমোরিজ অব ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ কর্ণারে পৌঁছায়, তখন সেখানে এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। বাতাসে দুলছিল জুলাই শহিদদের মুখচ্ছবি সংবলিত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সেখানে উপস্থিত কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি যখন তারা দেখেন:শহিদ জাহিদুজ্জামান তানভীনের নিজের হাতে বানানো জাতীয় সংসদ ভবনের একটি নিখুঁত মিনিয়েচার।
সৌদি প্রবাসী শহিদ আবু ইসহাকের সেই রক্তে ভেজা জামা, যা বিদেশের আরাম আয়েশ ছেড়ে দেশের টানে প্রাণ দেওয়ার সাক্ষী হয়ে আছে।
২০০৯-এর পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং শহিদ আবরার ফাহাদের স্মৃতি কর্নার।
মুক্তির প্রতিবিম্ব ও আগামীর পথ
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এই জাদুঘরকে ‘ফ্যাসিজম থেকে মুক্তির প্রতিবিম্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “বাংলার দামাল ছেলেরা গণতন্ত্রের জন্য নিজেদের বর্তমানকে উৎসর্গ করেছে আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য।”
সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে জানান, চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষে অথবা আগস্টের শুরুতে জাদুঘরটি সর্বসাধারণের দর্শনের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। বর্তমানে ফিনিশিং টাচ ও সুরক্ষার কাজ চলছে দ্রুতগতিতে।
পরিশেষে,
পরিদর্শন শেষে সংসদীয় দলটি যখন প্রস্থান করছিল, তখনো জাদুঘরের দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিগুলো যেন চিৎকার করে বলছিল— ‘স্মৃতি সতত সুখের নয়, তবে স্মৃতিই আগামীর প্রেরণা’। জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘর কেবল অতীতকে মনে রাখার জায়গা নয়, বরং ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচার যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, তার এক প্রখর হুঁশিয়ারি।
“জুলাই যোদ্ধারা জাতির ভবিষ্যতের জন্য তাদের বর্তমানকে উৎসর্গ করেছেন।”— হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, স্পিকার