দুর্যোগের ঝাপটা সামলাবে এনজিও-এমএফআই জোট: মানবিক অর্থায়নে নতুন এক মাইলফলক
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলার আকাশে যখন দুর্যোগের কালো মেঘ জমে, তখন সবার আগে লড়াই শুরু হয় একদম প্রান্তিক জনপদে। সেই লড়াকু মানুষদের হাতকে আরও শক্তিশালী করতে এবার দেশে চালু হলো এক অনন্য উদ্যোগ— ‘এনজিও-মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন (এমএফআই) রিসোর্সড পুলড ফান্ড’। স্থানীয়ভাবে পরিচালিত মানবিক অর্থায়ন এবং দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতাকে এক সুতোয় গাঁথতেই সোমবার রাতে রাজধানীর মিন্টো রোডের একটি অভিজাত হোটেলে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই নতুন তহবিলের যাত্রা শুরু হয়।
এই সূচনালগ্নের গল্পের পরতে পরতে ছিল আগামীর বাংলাদেশের জন্য এক আশাবদী ছবি। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন, তখন তাঁর কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল দৃঢ় প্রত্যয়। তিনি এই উদ্যোগকে দেশের উন্নয়নের পথে এবং বিপদের দিনে একটি বড় রকমের ‘মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, বিপদে পড়ার পর সাহায্যের অপেক্ষায় বসে না থেকে, দুর্যোগের পূর্বাভাস পেয়েই যেন মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেই স্বপ্নই দেখাবে এই তহবিল।
গল্পটা আসলে সমন্বয়ের। স্টার্ট বাংলাদেশ হাব-এর হাত ধরে গড়ে ওঠা এই জোটে শামিল হয়েছে ইএসডিও, এনডিপি, পপি এবং এসকেএস ফাউন্ডেশনের মতো অভিজ্ঞ সব জাতীয় এনজিও। তারা কেবল ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং মাইক্রো ফাইন্যান্স বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বিশাল নেটওয়ার্ক আর আর্থিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই সুরক্ষা কবচ তৈরি করতে চায়। বিজ্ঞপ্তিতে উঠে এসেছে সেই স্বপ্নের কথা—কীভাবে দেশি-বিদেশি ৪০টি এনজিওর এই বিশাল পরিবার (২২টি স্থানীয় ও ১৮টি আন্তর্জাতিক) স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পৌঁছে দেবে মাঠকর্মীদের হাতে।
অনুষ্ঠানের আলোকোজ্জ্বল আবহে যখন পিকেএসএফ-এর চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান কিংবা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির মো. হেলাল উদ্দিনরা কথা বলছিলেন, তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে এটি কেবল কোনো কাগুজে তহবিল নয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব থেকে শুরু করে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক—প্রত্যেকের কণ্ঠেই ছিল একই সুর: দুর্যোগের আঘাত আসার আগেই যেন অর্থ পৌঁছায় দুর্গতদের দুয়ারে। সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মার্টিল্ডা সভেনসনের উপস্থিতিও মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, স্থানীয় এই প্রচেষ্টায় বিশ্বজনীন বন্ধুত্বের ছোঁয়াও রয়েছে।
রাত যত গভীর হয়েছে, হোটেলের সেই সম্মেলন কক্ষ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে এক নতুন ভরসার বার্তা। এখন থেকে সাইক্লোন কিম্বা বন্যার পূর্বাভাস পেলেই হয়তো প্রান্তিক মানুষের চোখে আর কেবল অন্ধকার থাকবে না; থাকবে এই তহবিলের মাধ্যমে দ্রুত মানবিক সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা। স্থানীয় এনজিওগুলোর গভীর মমত্ব আর মাইক্রো ফাইন্যান্সের গাণিতিক শৃঙ্খলা মিলেমিশে বাংলাদেশকে দুর্যোগ সহনশীল এক অগ্রগামী জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে নতুন করে চিনিয়ে দেবে—এমনই প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হয় এই ঐতিহাসিক উদ্বোধনী রজনী।