সংবাদ শিরোনাম

স্মার্ট ঢাকা: এবার ট্রাফিক আইন ভাঙলেই পকেটে পৌঁছাবে ডিজিটাল মামলার বার্তা

 প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০৯:০০ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

স্মার্ট ঢাকা: এবার ট্রাফিক আইন ভাঙলেই পকেটে পৌঁছাবে ডিজিটাল মামলার বার্তা

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​ঢাকার ব্যস্ত সড়কের মোড়ে মোড়ে এখন অদৃশ্য প্রহরীর চোখ। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের হাত তোলা কিংবা বাঁশির শব্দের অপেক্ষায় আর থমকে থাকবে না যানচাহন। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে চেনা ঢাকা। রাজপথের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবার সরাসরি ‘স্বয়ংক্রিয় মামলা’র যুগে প্রবেশ করল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এখন থেকে সিগন্যাল অমান্য করা কিংবা আইন ভাঙার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তৈরি হবে ভিডিও প্রমাণ, আর সেই বার্তা মুহূর্তেই চলে যাবে বিআরটিএ-র তথ্যভাণ্ডারে থাকা গাড়ির মালিকের ঠিকানায়।

​সোমবার দুপুরে বিমানবন্দর ক্রসিংয়ে সৌরবিদ্যুৎ চালিত ‘ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট’ উদ্বোধনকালে এক স্বপ্নের মতো ভবিষ্যতের রূপরেখা আঁকলেন ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার। রোদে পোড়া তপ্ত দুপুরে তিনি শোনালেন ঢাকার সড়কের এক আধুনিক ও গতিশীল গল্পের কথা।

​আগামী ছয় মাসের পূর্ণাঙ্গ লক্ষ্য

ভারপ্রাপ্ত কমিশনারের কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাসের সুর। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আগামী ৬ মাসের মধ্যে ঢাকার সড়কে পূর্ণাঙ্গরূপে স্বয়ংক্রিয় মামলা চালু করা সম্ভব হবে। তখন সার্জেন্ট বা ট্রাফিক পরিদর্শকদের আর ঘাম ঝরিয়ে ম্যানুয়াল মামলা করতে হবে না। যেকোনো স্থানে ট্রাফিক বা মোটর ট্রান্সপোর্ট আইন ভাঙলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা হয়ে যাবে।” তিনি জানান, ইতোমধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়ে জাহাঙ্গীর গেট থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল এবং হাইকোর্ট থেকে গুলশান পর্যন্ত অসংখ্য পয়েন্টে সিগন্যাল লাইট বসেছে। ডিএমপি নিজেও ১৫টি পয়েন্টে এই আলোকবার্তা সচল করেছে।

​এআই ক্যামেরা: এক অদৃশ্য বিচারক

শহরের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এখন ডিউটি করছে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তির ক্যামেরা। এর কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে মো. সরওয়ার বলেন, “আমরা গত সপ্তাহ থেকেই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডিজিটাল বা অটোমেটিক মামলা করা শুরু করেছি। এই আধুনিক সফটওয়্যারটি আইন ভঙ্গকারী যানবাহন শনাক্ত করে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজ তৈরি করে। এরপর বিআরটিএ ডাটাবেজ থেকে মালিকের ঠিকানা নিয়ে সরাসরি প্রসিকিউশন চিঠি পাঠানো হচ্ছে। খুব শিগগিরই মোবাইল এসএমএস বা অ্যাপের মাধ্যমেই মানুষ মামলার তথ্য জানতে পারবে এবং ঘরে বসেই জরিমানা পরিশোধ করতে পারবে।”

​তিনি আরও যোগ করেন যে, গত এক সপ্তাহেই এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তিন শতাধিক মামলা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা দিনে এক হাজারে পৌঁছাবে বলে তিনি ধারণা করছেন। এমনকি বকেয়া থাকা ১ লাখ মামলার মধ্যে ৬৭ হাজার মামলাই নিষ্পত্তি করা হয়েছে ডিএমপি ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে।

​৫ থেকে ১০ কিলোমিটারে উন্নীত গতিবেগ

ঢাকার স্থবির হয়ে যাওয়া রাস্তায় প্রাণের স্পন্দন ফেরার খবরও দিলেন কমিশনার। তিনি আনন্দের সাথে জানান, “২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গড় গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারের নিচে। কিন্তু আমাদের নিরলস প্রচেষ্টায় ২০২৫-২৬ সালে সেই গতিবেগ এখন ১০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে।” এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে স্পিড ক্যামেরার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এবার ৩০০ ফুট পূর্বাচল সড়কেও ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর কথা জানান তিনি।

​সমন্বয়েই কাটবে জট

রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে জনদুর্ভোগের দিন শেষ হতে চলেছে বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি। বিভিন্ন সংস্থার সাথে সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সিটি কর্পোরেশন বা ওয়াসা—যেই রাস্তা কাটুক না কেন, এখন থেকে আমাদের সাথে সমন্বয় করেই কাটবে। তারা বিকল্প সড়ক বা বাইপাস রেখে কাজ করবে, যাতে ট্রাফিক জ্যাম না হয়।” পাশাপাশি কুড়িল বিশ্বরোডের অসহনীয় চাপ কমাতে ৩০০ ফুট থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত নতুন একটি সংযোগ সড়ক চালুর সুখবরও দিয়েছেন তিনি।

​ঢাকার রাজপথ এখন কেবল কংক্রিটের বিছানা নয়, বরং প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এক সুশৃঙ্খল স্মার্ট নগরের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। কমিশনারের কথায় স্পষ্ট—শহরের শৃঙ্খলা এখন আর পুলিশের বাঁশিতে নয়, বরং সিসি ক্যামেরার লেন্স আর ডিজিটাল সংকেতের ওপর নির্ভর করছে।