সন্ধ্যার মধ্যে মার্কেট বন্ধের নির্দেশ: ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়েই সমৃদ্ধির স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রীর
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আজ এক ভিন্ন আমেজ। চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঞ্চে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল একদিকে রাষ্ট্রের কঠিন বাস্তবতার চিত্র, অন্যদিকে এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই তিনি প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—বিদ্যুৎ সাশ্রয়। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে বাজার-ঘাট ও মার্কেট বন্ধ করার যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তা বাস্তবায়নে ডিসিদের আপসহীন ও তৎপর হতে হবে।
ঋণের পাহাড় ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ
বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি রূঢ় চিত্র তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় উত্তরাধিকার সূত্রে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের অর্থনীতি কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল, তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "দেশকে আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছিল; অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল বিচার বিভাগ, শিক্ষা ও দুদককে।" তবে প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত আড়াই মাসে অর্থনীতিতে কিছুটা উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পেশাদারত্ব ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বার্তা প্রশাস
নের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী এক শক্তিশালী বার্তা দেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থ বা পদোন্নতির লোভে পেশাদারত্বের সঙ্গে আপস করা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিগত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকলে যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, তা গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি ঘোষণা করেন, "সততা, মেধা ও দক্ষতাই হবে পদোন্নতি বা বদলির মূল মাপকাঠি—এটাই বিএনপির নীতি।"
মাঠ প্রশাসনের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশনা
জনদুর্ভোগ লাঘব এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী ডিসিদের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। বন্যা ও খরা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম জোরদার করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া বাজারে খাদ্যে ভেজাল রোধ, বাল্যবিবাহ বন্ধ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন না করতে কর্মকর্তাদের সতর্ক করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষে একটি স্বপ্নের কথা বলেন—এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ তার অধিকার ফিরে পাবে। পুরোপুরি বৈষম্য দূর করা কঠিন হলেও, একটি নৈতিক ও বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনই তাঁর সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ডিসি সম্মেলনের এই উদ্বোধনী পর্বটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফেরানোর এক নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।