নারীর উন্নয়নে বাধা ও উত্তরণের উপায়

 প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:১৯ অপরাহ্ন   |   সম্পাদকীয়

নারীর উন্নয়নে বাধা ও উত্তরণের উপায়

ম. জাভেদ ইকবাল

উপমহাদেশে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার ভাবনাটি ছিলো এমন- "কোনোও শকটের (গাড়ির) দুটো ঢাকা যদি সমান না হয়, তাহলে সেই গাড়ি চলতে পারে না। অসমান ঢাকা নিয়ে গাড়িটি চালাতে গেলেই সেটি একই চক্রে শুধু ঘুরপাক খেতে থাকবে।" এ তত্ত্বে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন- সমাজ, দেশ ও জাতির সামনে এগিয়ে চলার পথে রূপক যানবাহনটির দুটি ঢাকা হলো নারী ও পুরুষ। যানটির দুটো চাকার পরিধি সমান না হলে তা সামনে এগোনো সম্ভব নয়। দেশে-সমাজে-সংসারে নারীর ক্ষমতা ও মর্যাদা পুরুষের তুলনায় ভীষণভাবে অসমান। তাই আমরা যে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের গাড়িটি চালাতে চাচ্ছি সেটা সামনে এগোতে পারছে না। কোনো দেশের উন্নয়নের জন্য সে দেশের অর্ধেক অংশ অর্থাৎ নারী জনগোষ্ঠী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে এসময় অবধি নারী-উন্নয়নের ধারাটি যদি লক্ষ্য করা যায় তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশের নারীরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও আজও সামষ্টিকভাবে নারী ক্ষমতায়নের প্রশ্নে মানুষের ধ্যান-ধারণার তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। এখনও সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীদের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়।

সমাজে নারীর দুর্বল অবস্থান, অশিক্ষা, দারিদ্র্য আর কুসংস্কারের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রথম বাধাটাই আসে পরিবার থেকে। সরাসরি বললে, সন্তান হিসেবে কন্যা শিশুর জন্মটিও সব পরিবারে আনন্দ বয়ে আনে না, বৈষম্য যেন এখান থেকেই শুরু হয়। তবে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। নারীর উন্নয়ন চাইলে তার ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে আপস করা চলে না। কারণ, দুইটি বিষয়ই একে অন্যের পরিপূরক।

নারী উন্নয়নে বাধার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়, দারিদ্র্যের স্থান তার শীর্ষে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি হচ্ছে নারী শিক্ষা ও নারীর প্রশিক্ষণের অভাব। শুধু শিক্ষা নয়, দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের নারীরা আরেকটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে; আর সেটা হলো স্বাত্ম্য। এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক বেশি পিছিয়ে আছে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে নারী উন্নয়নের পথে আরও একটি বড়ো বাখা। পুরুষতন্ত্র উগ্র হয়ে উঠলেই এ সহিংসা দেখা দেয়। বাংলাদেশের পশ্চাৎপদ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত হয়ে আসছে। নারীরা যেমন ঘরে নিরাপদ নয় তেমনি বাইরেও নয়। কারণ নারীর প্রতি সহিংসতার হার বৃদ্ধিসহ নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে উত্ত্যক্তকরণ। এই নিগ্রহের ফলে সমাজে নারীর প্রতি প্রতিনিয়ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। উত্ত্যক্তকরণ বলতে একজন মানুষের প্রতি অপর একজনের অশালীন আচরণ বা অঙ্গভঙ্গিকে বোঝায়। উত্ত্যক্তের ঘটনা সাধারণত রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য স্থানে ঘটে থাকে। উত্ত্যক্তকরণ বিষয়টি আমাদের সমাজে নতুন না হলেও সম্প্রতি এটি বড়ো ধরনের রূপ ধারণ করেছে। ফলে স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নারীর সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে।

দারিদ্র্য বিষয়টি নারীর শিক্ষা, স্বায্য্য এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং রক্ষণশীলতা নারীর অগ্রগতি ও ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্ত করে, বিশেষত পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্বের কারণে নারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি এবং সাইবার সহিংসতার মতো বিষয়গুলো নারীকে নিরাগভাহীন করে তোলে এবং তাদের কর্মস্থলে ও সমাজে অংশগ্রহণের সুযোগ কমিয়ে দেয়। আবার, নারীর নিজের উপার্জনের উপর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ না থাকা এবং অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল হওয়া নারীর ক্ষমতায়নের পথে একটি বড়ো প্রতিবন্ধকতা। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন অথবা উচ্চশিক্ষিত হলেও পারিবারিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকেন। এছাড়া, কর্মক্ষেত্রেও তারা যৌন হয়রানি এবং বৈষম্যের শিকার হন, যা তাদের উপার্জনের সুযোগকে সীমিত করে। সমাজে শ্রমের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনও একটি বড়ো বাধা, কারণ নারীরা প্রায়শই নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে এবং পেশাগত উন্নয়নে সুযোগ পায় না। এই বাধাগুলো দূর করতে হলে প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা এবং সকল প্রকার সহিংসতা ও বৈষম্য প্রতিরোধ করা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেই যেখানে নারীদের পদযাত্রায় বারবার হোঁচট খেতে হয়, সেখানে তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশের নারী হিসেবে বাঙালি নারীদের প্রতিটি পদক্ষেপে অনেক বেশি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়ই। অশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নারী উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। অথচ সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নারীরা আজ শুধু রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নেই, নারীরা পৌঁছে গেছেন বিমানের ককপিট থেকে পর্বতশৃঙ্গে। দশভুজা নারী ঘরে-বাইরে নিজেকে আলোকিত করছেন নিজ গ্রজ্ঞা আর মেখা দিয়ে। বর্তমানে এমন কোনো পেশা নেই যেখানে নারীর মর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতি নেই।

নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কিত বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেন্ডারকেন্দ্রিক উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে এ মন্ত্রণালয় ধারাবাহিকভাবে সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। পরিচালন বাজেটে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা হয়েছে, যা ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে পরিচালন বাজেটে জেন্ডারসংশ্লিষ্ট বরাদ্দ হিসেবে ৯৮ শতাংশে স্থিতিশীল রয়েছে। উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দের ওঠানামা লক্ষ্যণীয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেন্ডারসংশ্লিষ্ট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়। নারীর সমাধিকার ও নারীমুক্তির কথা যতই বলা হোক না কেন- উন্নত, অনুন্নত, উন্নয়নশীল সব দেশেই নারীরা কম-বেশি সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার। সামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র সবক্ষেত্রে প্রায় একই। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই নারী, কিন্তু নারীর অগ্রগতি ও উন্নয়ন পরিলক্ষিত হচ্ছে খুব অগ্ন সংখ্যক নারীর মধ্যেই। তাদের অনেকেই নিজের সিদ্ধান্তে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন না এবং নিজের বস্তুগত ক্ষমতার পরিসরও স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে বাধাগ্রস্ত হন।

নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় মনে করে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১-এর আলোকে প্রস্তুতকৃত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২১-২০৩০) বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। একইসঙ্গে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠন করা আবশ্যক। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং শিশু সুরক্ষায় সামগ্রিক সমন্বয়, পরিবীক্ষণ এবং তদারকির জন্য ন্যাশনাল সেন্টার অন জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্সকে Centre of Excellence হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। নারী অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল ডেটাবেইজ তৈরি করা ও ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার এবং ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেল-এর ডেটাবেইজ তৈরি করায় ব্যাপারটিও এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই। নারীর অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বাজেটে সরকারের উদ্যোগগুলোর প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করলে সেটা দুরের উল্লেখ থাকতে হবে। পুরুষের আধিপত্যের বিপরীতে নারীর করণীয়, নারীর সচেতনতা বৃদ্ধি, ধর্মীয় কুসংস্কারকে দূর করার জন্য কী ধরনের কর্মসূচি নিতে যাচ্ছে তার সুনির্দিষ্ট উল্লেখও থাকা প্রয়োজন।

উপরন্তু, স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য যে কোটা চালু করা হয়েছিল, তা নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি ঐতিহ্যগত জেন্ডার ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করতে সাহায্য করেছে এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছে। নারী ও কন্যাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ উন্নত হয়েছে, যার ফলে সাক্ষরতার হার উচ্চতর হয়েছে এবং তাদের অধিকার ও ক্ষমতা সম্পর্কে আরও বেশি সচেতনতা বেড়েছে। কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল গতিশীলতাও সমাজে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে ধারণার পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। এ প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ, বাংলাদেশে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীরা এখন পোশাক উৎপাদন, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সেবা খাতসহ বিভিন্ন সেক্টরে সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত রয়েছে। উপরন্তু, আরও বেশি নারী উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করছে। বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের এ উদাহরণটি দেখায় কীভাবে লক্ষ্য উদ্দীষ্ট জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে, সহায়ক নীতি এবং পরিবর্তনশীল মনোভাব জেন্ডার সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটাতে পারে। নারীর ভূমিকা ও মর্যাদার পরিবর্তন শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনকেই উন্নত করে না বরং দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতেও অবদান রাখে। তথ্যপ্রযুক্তিখাতে নারীর প্রবেশ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, নারীর স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারে। ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নারীর জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে সহায়ক হয়েছে। বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য আইসিটি শিক্ষা প্রসারিত হয়েছে, যা তাদের কর্মক্ষেত্রে যোগদান এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। অনেক নারী এখন ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং, এবং অনলাইন ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন। নারী সমাজের উন্নয়ন যাত্রায় এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

এটা নিশ্চিত যে, দেশের অর্ধেক অংশ নারীকে তাদের অধিকার ভোগ করতে না দিয়ে, নির্ঘাতন করে দমিয়ে রেখে দেশ সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না। নারীর সম উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে, স্বয়ং নারীকেও। তাই নারীর নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও নারী-পুরুষ উভয়ের অন্তর্ভুক্তিতেই উন্নয়নের দেখা পাওয়া সম্ভব। এভাবেই নারীরা এগিয়ে যাবে, তাদের ভবিষ্যৎ হবে কণ্টকমুক্ত।

Advertisement
Advertisement
Advertisement