ফটোজার্নালিজমে অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি: আলোকচিত্রী মোহাম্মদ হাসানের সৃজনশীল যাত্রা
মাসুদ আল হাসান: দেশের সমসাময়িক ফটোজার্নালিজম অঙ্গনে নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত এক নাম মোহাম্মদ হাসান। বর্তমানে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দৈনিক আজকের পত্রিকা-তে স্টাফ ফটোজার্নালিস্ট হিসেবে কর্মরত আছেন।
১৯৯৫ সালের ১লা এপ্রিল ঢাকার দোলাইরপাড়ে এক সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হাসান। শৈশব থেকেই প্রাণবন্ত ও ক্রীড়াপ্রিয় এই তরুণ একসময় ক্রিকেট মাঠেই নিজেকে খুঁজে পেতেন। তবে সময়ের সাথে তিনি উপলব্ধি করেন—ক্যামেরা শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং এটি অনুভূতি, বাস্তবতা এবং সময়ের গল্প বলার শক্তিশালী মাধ্যম। সেই উপলব্ধিই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
২০১০ সালে ‘ফোকাস বাংলা নিউজ এজেন্সি’-এর মাধ্যমে তার পেশাগত পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি দ্য ডেইলি ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম এবং অর্থসূচকটোয়েন্টিফোর ডটকম-এর মতো স্বনামধন্য গণমাধ্যমে স্টাফ ফটোজার্নালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে পেশাগত দক্ষতা ও দায়বদ্ধতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
তার ক্যামেরার ফ্রেম শুধু নান্দনিক দৃশ্য ধারণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। গত দেড় দশকে তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ ও ধারণ করেছেন দেশের উল্লেখযোগ্য কিছু ঐতিহাসিক ও সংকটময় ঘটনা—রানা প্লাজা ধস, তাজরীন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ড, ৫ই মে’র শাপলা চত্বরের উত্তাল পরিস্থিতি, যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের মুহূর্ত, হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ। প্রতিকূল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও সত্যকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার সাহসিকতা প্রশংসনীয়।
মোহাম্মদ হাসানের সংবেদনশীলতা তার কাজের অন্যতম শক্তি। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন নিজের ব্যক্তিগত আনন্দের চেয়ে অন্যদের উচ্ছ্বাস ও আবেগকে ক্যামেরাবন্দী করার মধ্য দিয়ে তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার পর ২০২৬ সালে সহকর্মীদের উৎসাহে তিনি বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং ‘ধরা’ আয়োজিত আন্তর্জাতিক মানের আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা—“প্রকৃতি ও পরিবেশ: ছবিতে পৃথিবীর প্রতিধ্বনি”-তে অংশগ্রহণ করেন। এতে তিনি পরিবেশ ক্যাটাগরিতে সম্মানজনক দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন, যা তার পেশাগত জীবনে নতুন স্বীকৃতি যোগ করে।
মোহাম্মদ হাসানের বিশ্বাস, একজন ফটোজার্নালিস্টের মূল দায়িত্ব হলো মানুষের অব্যক্ত গল্প, বেদনা ও সংগ্রামকে দৃশ্যমান করে তোলা। তার কাছে প্রতিটি ফ্রেম একটি নীরব দলিল—যেখানে সময়, সত্য এবং মানবিক অনুভূতি একত্রে ধরা পড়ে।
নিজের এই বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতা ধারণ করে তিনি আজও ক্যামেরা হাতে রাজপথে, মানুষের মাঝে, গল্পের সন্ধানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।