সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলায় তুরস্ককে বার্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার একটি বিমানঘাঁটিতে মঙ্গলবারের বিমান হামলা শুধু দামেস্কের জন্য নয়, তুরস্কের জন্যও ইসরায়েলের একটি সতর্কবার্তা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। হামলার দায় ইসরায়েলকে দেওয়া হলেও দেশটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি।
সিরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জর্ডান-তিন দেশই ইদলিবের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। সিরিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সংকট পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক নানার হাওয়াচ জানিয়েছেন, হামলায় শুধু রানওয়ে ও মজুত স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; কোনো যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়নি।
ম্যালকম এইচ কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের গবেষক খাদর খাদ্দুরের মতে, বিমানঘাঁটিতে বোমা হামলার অর্থ হলো, আগামী কয়েক বছরে নতুন সিরিয়া যেন কোনো ধরনের বিমানবাহিনী গড়ে তুলতে না পারে—ইসরায়েল সম্ভবত সেই বার্তাই দিতে চাইছে।
দামেস্কের জন্য সতর্কবার্তা
২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর সিরিয়ার বিদ্রোহীরা দামেস্ক দখল করে বাশার আল-আসাদ সরকারকে উৎখাত করে। এর পরপরই ইসরায়েল সিরিয়ার সামরিক ঘাঁটি ও বিভিন্ন অবকাঠামোয় বিমান হামলা চালায়। এসব হামলায় নতুন সিরীয় সরকারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
আসাদ সরকারের পতনের পরপরই ইসরায়েল সিরিয়ার গোলান মালভূমির কয়েকটি এলাকা দখল করে নেয় এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জাবাল আল-শেখ এলাকাও নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি চৌকি স্থাপনের পাশাপাশি সিরীয় নাগরিকদের হয়রানি ও অপহরণের অভিযোগও উঠেছে।
২০২৫ সালের মার্চে ইসরায়েল সিরিয়ার দুটি বিমানঘাঁটি-হোমসের টি-৪ ও পালমিরা বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে তখন বলা হয়েছিল, হামলার আগে ওই ঘাঁটিগুলো তুরস্কের সামরিক প্রতিনিধিদল পরিদর্শন করেছিল।
একই বছরের জুলাইয়ে দামেস্কের কেন্দ্রস্থলে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়েও হামলা চালায় ইসরায়েল।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বারবার বলে আসছেন, সিরিয়ার নতুন সরকার তাদের জন্য হুমকি। অথচ দামেস্কের নতুন প্রশাসন পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার সিরিয়ার সেনাদের দামেস্কের দক্ষিণে, অর্থাৎ ইসরায়েলি সীমান্তের কাছাকাছি, না যাওয়ার বিষয়ে একাধিকবার সতর্ক করেছে। অন্যদিকে সিরিয়ার নতুন সরকারও বারবার জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না।
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের সহযোগী জ্যেষ্ঠ নীতি বিশ্লেষক আসলি আইদিনতাশবাস বলেন, সিরিয়া ইসরায়েলের জন্য কোনো হুমকি ছিল না এবং দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছিল। আসাদ সরকারের পতনের পর সিরীয়রা ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক চায়—এ কথাও তারা স্পষ্ট করেছে বলে জানান তিনি।
সিরিয়ার বিমানবাহিনী পুনর্গঠনে আপত্তি
বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়া তাদের বিমানবাহিনী পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় ইসরায়েল উদ্বিগ্ন। পুরোনো স্থাপনা ও বিমান মেরামত এবং নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণের মতো পদক্ষেপ এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে।
‘দ্য সিরিয়া রিপোর্ট’-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্যামি আকিল বলেন, সিরিয়ার একটি কার্যকর বিমানবাহিনী থাকা ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে সিরিয়ার অস্ত্রভান্ডারে এখনো থাকা যুদ্ধবিমানগুলো ইসরায়েলের জন্য বড় কোনো হুমকি তৈরি করে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আরব সেন্টার ফর কনটেম্পোরারি সিরিয়ান স্টাডিজের নিরাপত্তা ও সামরিকবিষয়ক গবেষক নাভার সাবানও মনে করেন, আবু আল-দুহুরে হামলার লক্ষ্য তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক হুমকি ধ্বংস করা নয়; বরং ভবিষ্যতের সামরিক সক্ষমতা গড়ে ওঠা ঠেকানো।
তার মতে, সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ইসরায়েল একটি ‘লাল রেখা’ টেনে দিতে চাইছে। বিশেষ করে তুরস্কের সহায়তায় সিরিয়ার বিমান সক্ষমতা বাড়তে পারে অথবা সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরায়েলের অবাধ সামরিক কার্যক্রম সীমিত হতে পারে-এমন সম্ভাবনা ঠেকানোই হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।
তুরস্কও কেন লক্ষ্য
আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটি ইদলিবের কাছাকাছি। অঞ্চলটি তুরস্কের প্রভাববলয়ের মধ্যে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে আসাদবিরোধী কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সমর্থন করেছে এবং উত্তর সিরিয়ায় এখনো দেশটির সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। সিরিয়ায় তুরস্কের প্রভাব নিয়ে ইসরায়েল আগেও উদ্বেগ ও বিরোধিতা প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরিয়ায় আঙ্কারার ভূমিকা নিয়ে নেতানিয়াহু নিরাপত্তা বৈঠক করেছেন এবং তুরস্কের সম্ভাব্য হুমকি নিয়েও কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি তুরস্ক।
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, যিনি অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে নেতানিয়াহুর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়েও রয়েছেন, তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ফলে আবু আল-দুহুরে হামলাকে শুধু সিরিয়ার সামরিক সক্ষমতা সীমিত করার পদক্ষেপ হিসেবে নয়, সিরিয়ায় তুরস্কের প্রভাব ও সামরিক সহযোগিতা নিয়েও ইসরায়েলের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
সূত্র: আলজাজিরা