ইউএসএস লিংকন নিয়ে তদন্ত চায় ডেমোক্র্যাটরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তের দাবি জোরালো করেছেন দেশটির ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থানের কারণে জাহাজটির নাবিকদের মানসিক চাপ, খাবার ও অন্যান্য সরবরাহের ঘাটতির খবর সামনে আসার পর মার্কিন নৌবাহিনীর প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ডেমোক্র্যাটদের অন্তত তিনটি পৃথক আবেদনে রণতরীটির রেকর্ড সময়ের মোতায়েনের জন্য নৌবাহিনী কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, লিংকনের পরিস্থিতি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনায় দুর্বল পরিকল্পনার একটি ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত হতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে গত নভেম্বরে যাত্রা শুরুর পর ইউএসএস লিংকন ভেনেজুয়েলা এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে। এরপর থেকে জাহাজটি কোনো বন্দরে নিয়মিত বিরতির জন্য ভেড়েনি।
টানা ২৬০ দিনের বেশি সমুদ্রে থাকার মধ্য দিয়ে লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কোনো বিরতি ছাড়া সবচেয়ে দীর্ঘ মোতায়েনের রেকর্ড গড়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জাহাজটির নাবিকদের কেউ কেউ খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকটের মধ্যে সমুদ্রের পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন-এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
কংগ্রেসে তদন্তের দাবি
মঙ্গলবার প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য প্যাট রায়ান নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাওকে পাঠানো একটি চিঠি প্রকাশ করেন। ২২ জন কংগ্রেস সদস্য ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় বর্তমান প্রশাসনের কর্মকৌশলের একটি ‘ধারাবাহিক ধারা’ হয়ে উঠেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের অবসানের কোনো লক্ষণ নেই। রায়ান উল্লেখ করেন, এই যুদ্ধের অংশ হিসেবে ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডও দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের রেকর্ড গড়েছিল। ওই রণতরীতেও নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ নিয়ে উদ্বেগজনক খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এপ্রিল মাসে ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যায়।
রায়ান ১৪ আগস্টের চিঠিতে লেখেন, ফোর্ডের পরপরই লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে একই ধরনের খবর প্রকাশিত হওয়ায় কংগ্রেস ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, নৌবাহিনী পরিস্থিতির সঙ্গে যথেষ্ট দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারছে না।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নৌবহরের চলমান সমস্যাগুলো কমাতে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ক্যালিফোর্নিয়ার আইনপ্রণেতাদের একটি প্রতিনিধিদলও পেন্টাগনের কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। ওই চিঠিতে ছিলেন দুই সিনেটর অ্যাডাম শিফ ও অ্যালেক্স প্যাডিলা।
এ ছাড়া ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের আরেকটি দল ১৫ আগস্ট প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে চিঠি দিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানায়। চিঠিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তকে ‘গভীরভাবে ভুল’ বলে অভিহিত করে বলা হয়, অনির্দিষ্ট যুদ্ধের কারণে অনির্দিষ্টকাল ধরে মোতায়েনের বাস্তব পরিণতি এখন মার্কিন সেনাসদস্যরা ভোগ করছেন।
লিংকন দেশে ফিরছে
আরও তথ্য ও তদন্তের দাবি এমন সময় উঠল, যখন ইউএসএস লিংকন যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত সপ্তাহে নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব কাও জানান, লিংকন শিগগিরই দেশে ফিরবে। একই সময়ে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে সরিয়ে লিংকনের স্থলাভিষিক্ত করতে পাঠানোর খবর আসে।
তবে জর্জ ওয়াশিংটনের চলে যাওয়ার ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরী থাকছে না। চীনের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা মোকাবিলার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে আসছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভিন্ন দাবি
লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেছেন, জাহাজটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’। ট্রাম্পও গত সপ্তাহে দাবি করেন, লিংকনকে ‘প্রায় যথেষ্ট সময়ের জন্যও’ মোতায়েন করা হয়নি। সোমবার জাহাজটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রতিবেদনগুলোকে ‘সিএনএনের ভুয়া প্রতিবেদন’ বলে উড়িয়ে দেন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারও এ সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি সম্প্রতি লিংকন পরিদর্শন করেছেন এবং জাহাজটির নাবিকদের ‘অসাধারণ’ মনে হয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, সবকিছু নিখুঁত নয়। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে দায়িত্ব পালন সবার জন্য উপযোগী নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে লিংকনের নেতৃত্ব মানসিক স্বাস্থ্য ও নাবিকদের মানসিক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে প্রশংসা করেন।
ডেমোক্র্যাটদের বিপরীতে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের অধিকাংশ আইনপ্রণেতা লিংকনের নাবিকদের মানসিক চাপ ও সরবরাহ সংকটের খবর নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি। তবে রিপাবলিকান প্রতিনিধি ডন বেকন রোববার সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে বলেন, বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসের নজরদারি থাকা উচিত।
সূত্র: আলজাজিরা