বাজেটের আগে স্বস্তির বার্তা, তবে রাজস্ব লক্ষ্যে রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন

 প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:২৮ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

বাজেটের আগে স্বস্তির বার্তা, তবে রাজস্ব লক্ষ্যে রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন

দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের সংকটে চাপে রয়েছে, ঠিক তখনই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট ঘোষণা হতে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত মিলেছে—এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে শুল্ক ও কর কাঠামোয় এমন কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব আসছে, যার প্রভাবে অনেক পণ্যের দাম কমতে পারে।

তবে একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বেশি। অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, বিপুল কর-ছাড় দিয়ে এত বড় রাজস্ব সংগ্রহ কীভাবে সম্ভব হবে?

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কর-ছাড়ের পথ

বাজেটসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জনগণের ওপর চাপ কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, জ্বালানি তেল, মোবাইল ফোন শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে কর ও শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব সুবিধার প্রভাব বাজারে পৌঁছালে ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

বিশেষ করে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ বহু কৃষিপণ্যের উৎস কর কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির খরচ কমলে উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পেতে পারে।

বিনিয়োগ বাড়াতে প্রণোদনা

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করতে ইলেকট্রনিকস, স্বাস্থ্যসেবা, সৌরবিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিখাতে দীর্ঘমেয়াদি কর-সুবিধা দেওয়া হতে পারে। কয়েকটি খাতে ২০৩১ কিংবা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতির কথাও বিবেচনায় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কর-ছাড় বিনিয়োগে সহায়ক হলেও শুধু এটুকু যথেষ্ট নয়। ব্যাংক ঋণের সুদহার, জ্বালানি সরবরাহ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া ও ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত না হলে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আসবে না।

যেসব পণ্যে কমতে পারে দাম

প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলোর ফলে যেসব খাতে মূল্য কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্য
  • শিল্পের কাঁচামাল
  • স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভোজ্যতেল
  • জ্বালানি তেল
  • ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও কিছু চিকিৎসাসামগ্রী
  • ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামাল
  • হার্টের রিং ও চোখের লেন্স
  • মোবাইল ফোন ও সিম
  • সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম
  • বৈদ্যুতিক গাড়ি ও চার্জিং অবকাঠামো
  • স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার
  • কম্পিউটার ও প্রযুক্তিপণ্য
  • পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্যখাতের কিছু কাঁচামাল

যেসব পণ্যে বাড়তে পারে ব্যয়

অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ ও বিলাসপণ্যে কর বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে দাম বাড়তে পারে—

  • সিগারেট
  • নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো
  • কাজুবাদাম
  • বিলাসবহুল ও উচ্চ করসীমার গাড়ি
  • দেশীয় উৎপাদিত মদ
  • রড ও কিছু নির্মাণসামগ্রী
  • আমদানি করা পাঙ্গাস মাছের ফিলেট
  • হেলিকপ্টার পরিচালনা ব্যয়
  • জুয়ার আয়ের ওপর কর

বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

অর্থনীতিবিদদের মতে, জনগণকে স্বস্তি দিতে কর-ছাড়ের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি না বাড়লে এবং কর ফাঁকি ও করজালের বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে এবারের বাজেটের মূল বার্তা হতে পারে—দাম কমানোর চেষ্টা ও বিনিয়োগে উৎসাহ, কিন্তু সেই সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহের বাস্তবতা নিয়ে বড় এক পরীক্ষাও অপেক্ষা করছে সরকারের সামনে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement