ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের নতুন দিগন্ত: চিফ হুইপের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের বৈঠক, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশংসা
মহানগর ডেস্ক ১৯ মে ২০২৬
এক বর্ণিল কূটনৈতিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আবহে আজ মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলামের কার্যালয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে চিফ হুইপের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। এই প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের মিশনের উপপ্রধান মেগান বলডিন। তাঁর সঙ্গে কূটনৈতিক ও কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে বেগবান করতে আরও উপস্থিত ছিলেন মিশনের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এরিক গিলান এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ফিরোজ আহমেদ। অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্যের প্রসার এবং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত ও খোলামেলা আলোচনা হয়, যা আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈঠকের শুরুতেই চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবিচল সমর্থনের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদারই নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি পরীক্ষিত বন্ধু দেশ, যারা সবসময় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় পাশে থেকেছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করে চিফ হুইপ বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প খাতের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত বড় এবং অন্যতম প্রধান একটি বাজার। এই বাণিজ্যের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি বর্তমান সরকারের আইটি খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও তিনি প্রতিনিধি দলের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার তরুণ প্রজন্মের জন্য ডিজিটাল আইটি কর্মসংস্থান তৈরির যে মহৎ ও সময়োপযোগী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, প্রযুক্তিতে বিশ্বনেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই লক্ষ্য অর্জনে কারিগরি ও কৌশলগত সহযোগিতা দিয়ে আমাদের পাশে থাকবে—এটিই দেশের মানুষের প্রত্যাশা।
আলোচনার একপর্যায়ে দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন বৈপ্লবিক পদক্ষেপের কথা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়। চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনীতিকে একটি টেকসই ও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে দিনরাত প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং কৃষি ঋণ মওকুফের মতো বেশ কিছু জনকল্যাণমুখী ও যুগান্তকারী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই কর্মসূচিগুলোর সফল বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, যেকোনো দেশের সামগ্রিক এবং টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো মসৃণ ও নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক যাত্রা। গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে কোনো খাতের উন্নয়নই স্থায়ী বা অর্থবহ হতে পারে না, তাই সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের অনন্য স্থাপত্যশৈলী এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও এই কূটনৈতিক বৈঠকে বেশ গুরুত্বের সাথে স্থান পায়। মো. নূরুল ইসলাম গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, সংসদ ভবন কেবল আইনের শাসন আর জবাবদিহিতার প্রতীক নয়, এটি আমাদের গণতন্ত্রের এক মহান স্মারক। এই অনন্য কীর্তির মহান স্থপতি লুই আই কানকে বাংলাদেশের জনগণ সবসময় অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। চিফ হুইপের এই বক্তব্যের সঙ্গে পূর্ণ সহমত পোষণ করে মার্কিন মিশনের উপপ্রধান মেগান বলডিন সংসদ ভবনকে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী বন্ধুত্বের এক চিরন্তন প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে জানান, লুই কানের এই সৃষ্টি বিশ্ব স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি নিদর্শন হওয়ায় আমেরিকার স্থাপত্যবিদ্যার ছাত্ররা প্রায়শই এই ঐতিহাসিক ভবনটি নিজ চোখে দেখার গভীর ইচ্ছা পোষণ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময় প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ভৌগোলিক অখণ্ডতায় বিশ্বাস করে এবং এর সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
দ্বিপাক্ষিক এই আলোচনা কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আইনি সংস্কার এবং স্বাস্থ্য খাতের টেকসই উন্নয়নে মার্কিন আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে উঠে এসেছে। মেগান বলডিন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শ্রম আইন সংস্কারের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এই সংস্কার উদ্যোগকে ওয়াশিংটনে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং প্রগতিশীল পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যকার বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে দুর্নীতি দমন, পরিবেশ রক্ষা এবং বন্যপ্রাণী পাচার রোধের মতো বৈশ্বিক ও গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে তারা স্বাগত জানান। একই সাথে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সংক্রামক ব্যাধি সফলভাবে মোকাবিলার লক্ষ্যে আগামী ৫ বছরের জন্য ৯০ মিলিয়ন ডলারের এক বিশাল আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেন মার্কিন উপপ্রধান। এই অর্থায়ন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এক মাইলফলক ভূমিকা পালন করবে বলে উভয় পক্ষ আশা প্রকাশ করে।
বৈঠকের সমাপনী অংশে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। মার্কিন প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয় যে, বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন এবং সম্ভাবনাময় গণতান্ত্রিক দেশ। বর্তমান সরকারের নেওয়া বিভিন্ন বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক সংস্কার ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার উদ্যোগগুলো আগামীতে বড় বড় আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগে আরও বেশি আকৃষ্ট ও উৎসাহিত করবে। দুই দেশের নীতিনির্ধারকরা এই মর্মে একমত হন যে, ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক সম্পর্ক কেবল মাত্র কূটনৈতিক নথিপত্র বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর পরিধি ও গভীরতা আরও বহুদূর বিস্তৃত হবে। এই দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্ব আগামীতে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং একটি টেকসই ও বহুমুখী মৈত্রীর বন্ধনে রূপ নেবে। অত্যন্ত ফলপ্রসূ এই বৈঠক চলাকালে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত থেকে আলোচনার গতিপ্রকৃতিতে প্রশাসনিক ও কৌশলগত ইনপুট প্রদান করেন।