ঢামেকে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান: চিকিৎসার ‘সওদাগর’ ৪৯ দালাল আটক
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
ভোর থেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের করিডোরে ছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা। কেউ একজন রক্ত জোগাড় করে দেওয়ার নামে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল, কেউ আবার সরকারি সেবা না পাওয়ার ভয় দেখিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানোর ফন্দি আঁটছিল। কিন্তু আজ সোমবার সকালের সূর্যটা আর এই 'চিকিৎসার সওদাগরদের' পক্ষে ছিল না।
হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল থেকেই এনএসআই (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা) এবং শাহবাগ থানা-পুলিশের এক বিশাল বহর ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দারা আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন। যখনই দালালেরা রোগীদের বিভ্রান্ত করতে শুরু করে, তখনই তাঁদের হাতেনাতে পাকড়াও করা হয়।
যেভাবে চলত প্রতারণার জাল
অভিযানে আটক ৪৯ জনের অপরাধের ফিরিস্তি যেন এক একটি আতঙ্কের গল্প। হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এদের মধ্যে ছিল: প্যাথলজি প্রতিনিধি: সরকারি ল্যাবে পরীক্ষা না করে মোটা অঙ্কের কমিশনের লোভে বাইরের নিম্নমানের ল্যাবে পাঠাত তারা।
রক্তের দালাল: বিনামূল্যে রক্ত পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জরুরি প্রয়োজনের সুযোগ নিয়ে মোটা টাকা হাতিয়ে নিত।
আইসিইউ মাফিয়া: হাসপাতালে আইসিইউ বেড খালি নেই—এমন মিথ্যা আতঙ্ক ছড়িয়ে মুমূর্ষু রোগীকে প্রাইভেট হাসপাতালে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন পকেটে ভরত।
ওষুধ কোম্পানির অতৎপরতা: ডাক্তারদের রুমের সামনে জটলা পাকিয়ে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসায় বিঘ্ন ঘটানো।
ভেতরের শত্রুদের যোগসাজশ
তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং আনসার সদস্যের মদত ছাড়া এই দালাল চক্র এত দিন টিকে থাকা অসম্ভব ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখত। আজ আটককৃতদের মধ্যে এমন কয়েকজনের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে যারা দীর্ঘ দিন ধরে হাসপাতালের ভেতর থেকেই এদের আশ্রয় দিয়ে আসছিল।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
অভিযান শেষে আটক ব্যক্তিদের প্রিজন ভ্যানে করে শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়। পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম প্রথম আলোকে নিশ্চিত করে বলেন,
"ঢামেক থেকে আমরা ৪৯ জন দালালকে আটক করেছি। এরা সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাঁদের পকেট কাটছিল। হাসপাতালের পরিবেশ সুন্দর করতে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।"
ভুক্তভোগীদের দীর্ঘশ্বাস
অভিযান চলাকালে এক রোগীর স্বজন আক্ষেপ করে বলেন, "এখানে পা রাখলেই দালালরা ঘিরে ধরে। ওষুধ কেনা থেকে শুরু করে সিটি স্ক্যান—সবকিছুতেই তাদের হাত। আজ এদের আটক দেখে মনে হচ্ছে সাধারণ মানুষ অন্তত কিছুটা স্বস্তিতে ফিরবে।"
বিশেষ দ্রষ্টব্য: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং হাসপাতালের নিজস্ব স্টাফদের মধ্যে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হবে। ঢামেক এখন দালালমুক্ত করার এই চ্যালেঞ্জ কতটুকু ধরে রাখতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।