সমুদ্রযাত্রায় মৃত্যুর আতঙ্ক: হান্টাভাইরাসের হানা ও কিছু অজানা সতর্কতা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ৪ মে, ২০২৬
আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশির বুকে ভাসমান একটি বিলাসবহুল ডাচ প্রমোদতরী এখন এক অজানা আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দু। আনন্দের সফর রূপ নিয়েছে বিষাদে। তিন যাত্রীর রহস্যময় মৃত্যু এবং আরও কয়েকজনের অসুস্থতায় সামনে এসেছে এক বিরল ঘাতকের নাম— 'হান্টাভাইরাস'। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) ইতিমধ্যে জাহাজে একজনের সংক্রমণের খবর নিশ্চিত করেছে এবং আরও পাঁচজনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। যদিও সংস্থাটি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, তবে সমুদ্রের মাঝখানে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
ইঁদুর থেকে মানুষের শরীরে যেভাবে পৌঁছায় এই বিষ
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীদের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি কোনো সাধারণ ফ্লু নয়, বরং সরাসরি প্রকৃতির এক নীরব ঘাতক। ইঁদুরের লালা, মূত্র বা মল যখন শুকিয়ে ধুলোর সাথে মিশে বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তখন মানুষ অজান্তেই সেই বাতাস গ্রহণ করে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে বদ্ধ ঘরে জমে থাকা ইঁদুরের বর্জ্য ঝাড়ু দেওয়ার সময় এই ভাইরাসের কণাগুলো নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করে। এ ছাড়া ইঁদুরের কামড়, আঁচড় কিংবা দূষিত কোনো বস্তু স্পর্শ করে নাকে-মুখে হাত দিলেও এই ভাইরাস শরীরে জায়গা করে নেয়।
রোগের প্রকৃতি: অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ
হান্টাভাইরাস বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন ভয়াবহতা নিয়ে আবির্ভূত হয়। ইউরোপ এবং এশিয়ায় এটি মূলত 'হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম' (HFRS) হিসেবে পরিচিত। এর সংক্রমণে রোগীর শরীরে প্রচণ্ড মাথাব্যথা, পেটব্যথা এবং বমি বমি ভাব শুরু হয়। পরিস্থিতি জটিল হলে রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং কিডনি অকেজো হয়ে প্রাণহানি ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, আমেরিকায় এই ভাইরাসটি আরও বেশি ভয়ংকর। সেখানে এটি 'হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম' (HPS) নামে ফুসফুসের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। আক্রান্তের শুরুতে সাধারণ ফ্লু মনে হলেও দ্রুত ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরিসংখ্যান বলছে, এইচপিএস-এ আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশেরই মৃত্যু ঘটে। সম্প্রতি অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়ার মৃত্যু এই ভাইরাসের ভয়াবহতাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
প্রমোদতরীর রহস্য ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
সমুদ্রের মাঝখানে প্রমোদতরীতে কীভাবে এই ভাইরাস পৌঁছাল, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মহামারী বিশেষজ্ঞ ডঃ শার্লট হ্যামারের মতে, জাহাজ যখন বন্দরে ভেড়ে, তখন ইঁদুরের জাহাজে উঠে পড়া অসম্ভব কিছু নয়। আবার এমনও হতে পারে যে, যাত্রীরা আর্জেন্টিনা থেকে সংক্রমণের বীজ বহন করে এনেছেন, কারণ এই ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশ পেতে এক থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে মানুষ থেকে মানুষে এই সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। জাহাজটিকে বর্তমানে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে এবং প্রতিটি কোণা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
প্রতিকার ও বাঁচার উপায়
হান্টাভাইরাসের এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন নেই। আক্রান্ত হওয়ার পর কেবল উপসর্গ দেখে চিকিৎসা করা হয়। তাই প্রতিরোধের মাধ্যমেই এই যুদ্ধ জয় সম্ভব। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঁদুরমুক্ত পরিবেশ রাখাই এর প্রধান রক্ষাকবচ। বাড়ির প্রতিটি ছিদ্র বন্ধ করা, খাবার ঢেকে রাখা এবং ডাস্টবিন পরিষ্কার রাখাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। ইঁদুরের মল পরিষ্কারের সময় সরাসরি হাত না দিয়ে দস্তানা ব্যবহার এবং ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত পানি ব্যবহার করা জীবন রক্ষাকারী পদক্ষেপ হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও সচেতনতার অভাবে অনেক সময়ই এটি শনাক্ত হয় না। তাই জ্বর বা শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি যদি ইঁদুরের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস থাকে, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
তথ্যসূত্র: সিএনএন (CNN)