নির্বাচন সংক্রান্ত গুজব বনাম বাস্তবতা ও উত্তরণের পথ
নাসরীন জাহান লিপি
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে, যাতে বলা হয়েছে
"কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভুল প্রচারণা নয়, প্রযুক্তির অপব্যবহারে অরাজকতা হয়।
(AI) ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও বা
ডিপফেক ছড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রযুক্তি হোক সত্যের, প্রচারণা হোক স্বচ্ছতার। ফটোকার্ডের
নিচের অংশে সত্যতা জানানোর উপায় হিসেবে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট ঠিকানা দেওয়া হয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠাতব্য বাংলাদেশের গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচন উপলক্ষ্যে ছাড়া হয়েছে ফটোকার্ডটি। বোঝাই যাচ্ছে, নির্বাচন সংক্রান্ত গুজবের
বিষয়ে নির্বাচন কমিশন গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। না নিয়ে উপায় নেই। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান
পরবর্তী এই নির্বাচনটি বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহার
আর রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে তথ্য-সন্ত্রাস বা 'ইনফরমেশন বম্ব' নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে
চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক উত্তাপের সঙ্গে পাল্লা
দিয়ে বাড়ে গুজব, ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রবাহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে
এসব গুজব এখন আগের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় এবং এর প্রভাবও ভোটারদের মনে, সামাজিক সম্প্রীতিতে
এবং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর গভীরভাবে পড়ে।
নির্বাচন নিয়ে দেশজুড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে।
যত দিন যাচ্ছে, ততই উত্তেজনার পারদ চড়ছে। দীর্ঘ বিরতির পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের
অপেক্ষায় থাকা সাধারণ মানুষের উদ্দীপনাকে পুঁজি করে স্বার্থান্বেষী মহল সোশ্যাল মিডিয়া
ও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়াচ্ছে নানামুখী গুজব। কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া বা
প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারসাজি করা ছবি ও ভিডিও প্রচার করতে দেখেছি।
বিভিন্ন দলের মধ্যে কাল্পনিক জোট বা সমঝোতার খবর ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে।
ভোটকেন্দ্রে অস্থিরতা বা সংঘাতের ভুয়া খবর ছড়িয়ে ভোটারদের কেন্দ্রবিমুখ করার চেষ্টা
চলছে। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হয়ে গেছে ডিজিটাল কারসাজি (Deepfake)। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা AI
ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের
ভুয়া বক্তব্য বা ভিডিও তৈরি করে বিতর্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। সাধারণভাবে সত্যি মনে
হয় বলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হচ্ছে, পারস্পরিক অবিশ্বাস স্থানীয় পর্যায়ে
মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে সমর্থকদের। ইতোমধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে গেছে, যা অত্যন্ত
দুঃখজনক। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসবে তত গুজবের তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি বাড়বে। এমনকি
নির্বাচনের দিন, ভোট গণনা চলাকালীন সময়েও গুজব ডালাপালা মেলবে। হঠাৎ করে বলা হতে পারে-
নির্বাচন হবে না, ভোট স্থগিত হয়েছে, বা নির্দিষ্ট এলাকায় ভোট বাতিল। ভোটকেন্দ্র ও ব্যালট
নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হতে পারে। যেমন, আগেই ব্যালট ভর্তি হয়ে গেছে, ভোটকেন্দ্রে
সহিংসতা শুরু হয়েছে ইত্যাদি। কোথাও মারামারি বা সেনা মোতায়েন নিয়ে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা
খবর কম হয়নি। ভবিষ্যতে আরও হতে পারে।
গুজব ঠেকাতে গুজব ছড়ানোর মাধ্যম বন্ধ করে দিতে পারলে ভালো হয়- এটা
সাধারণ জ্ঞানের তথ্য মনে হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর মাধ্যম তথা ফেসবুক,
টিকটক, ইউটিউব বন্ধ করা মানবাধিকারের বিপক্ষে যায়। সঠিক তথ্য পেতে মূলধারার গণমাধ্যমকে
বাদ দিয়ে এসব মাধ্যমেই ব্রাউজ করছে মানুষ, এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। অথচ
ফেসবুক, টিকটক এবং ইউটিউবকে বর্তমানে গুজবের প্রধান চারণভূমি বানিয়ে বিশেষ করে প্রবাসী
কিছু কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং ছদ্মনামী পেজ থেকে অনেক সময় যাচাইহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে
পড়ে, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুজব সামাজিক যোগাযোগ
মাধ্যমে ছড়িয়েছে, যেগুলোকে বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত
করেছে। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়েছে একাধিকবার। নির্বাচনের তফসিল
ঘোষণার পর থেকেই বড়ো দলগুলোর মনোনীত প্রার্থীদের তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে একটি রাজনৈতিক দলের অফিসিয়াল প্যাড ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতার স্বাক্ষর
জাল করে একটি বিভাগের প্রার্থীদের একটি ভুয়া তালিকা ফেসবুকে ভাইরাল হয়। পরবর্তীতে দলটি
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানায় যে, ওই তালিকাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সম্প্রতি একটি এআই-জেনারেটেড (AI-generated) ভিডিওতে দেখা যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর
একজন সদস্য দাবি করছেন যে নির্দিষ্ট একটি দলের নেতা ক্ষমতায় আসলে বিশেষ সুযোগ-সুবিধার
প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ফ্যাক্ট চেক করে দেখা যায়, বাস্তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো
সদস্য এমন বক্তব্য দেননি: এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি একটি 'ডিপফেক'
ভিডিও।
নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থান নিয়ে প্রায়ই ভুল তথ্য ছড়ানো
হচ্ছে। কোনো এক দলের একজন নেতার কাছে জাতিসংঘের মহাসচিব ফোন করেছেন, এমন একটি ভুয়া
'ফটোকনটেন্ট' সম্প্রতি প্রচার করা হয়েছিল। এছাড়া কোনো কোনো বিদেশি রাষ্ট্রদূতের নামে
বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে কিছু ভুয়া উদ্ধৃতি ছড়ানো হচ্ছে, যার কোনো ভিত্তি নেই।
এছাড়া ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক উসকানি তো মাত্রাতিরিক্ত চলছে। ভোটারদের আবেগ ব্যবহার
করে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে গুজব ছড়িয়ে। ভোটারদের মধ্যে বিভাজন তৈরির জন্য
ছড়ানো হচ্ছে এসব। 'আঁখি'স স্টোরি' নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে বেশ কিছু ভিডিও প্রচার
করা হয়, যেখানে দাবি করা হয় যে একটি নির্দিষ্ট দল ইতোমধ্যেই জয় নিশ্চিত করে ফেলেছে
এবং অন্য দলগুলো ভোট কারচুপির পরিকল্পনা করছে। অতীতের কোনো নির্বাচনে ভোট দিতে আসা
ভোটারদের লাইন বা বিশৃঙ্খলার ভিডিওকে বর্তমান সময়ের বলে প্রচার করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির
চেষ্টা করা হচ্ছে।
গুজব প্রতিরোধে অন্তবর্তীকালীন সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে
নির্বাচন কমিশন (EC) বেশ কিছু কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়,
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সামাজিক মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি করার জন্য 'ফ্যাক্ট-চেকিং
সেল' বা বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনে শৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীকে
ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যারা গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা
নিতে পারবে। তবে, গুজব মোকাবিলা শুধু সরকারের নয়। এটি নাগরিক, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি
প্ল্যাটফর্ম- সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। গুজব প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও দরকারি।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস ইতোমধ্যে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক টিমের সহায়তা
চেয়েছেন যাতে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে আসা অপপ্রচার ও ভুল তথ্য (Disinformation) মোকাবিলা করা যায়। ইউনেস্কো এবং বিভিন্ন
নাগরিক সমাজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর (Meta, Google, TikTok) সাথে নিয়মিত সংলাপ করছে যাতে নির্বাচনকালীন
ক্ষতিকর কন্টেন্ট দ্রুত সরিয়ে ফেলা যায়।
তবে অপতথ্য ও গুজব প্রতিরোধ ও এসবের ফলে সৃষ্ট ক্ষতির প্রতিকারে
কেবল আইনের ওপর নির্ভর না করে এই দেশের নাগরিক হিসেবে ব্যক্তিগত সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি।
নাগরিক হিসেবে আপনার করণীয় হচ্ছে সংবাদ যাচাই করুন। ফেসবুকে কোনো চাঞ্চল্যকর খবর দেখলেই
শেয়ার করবেন না। মূলধারার বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যম (পত্রিকা বা টিভি) এবং নির্বাচন
কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট যাচাই করুন। লিঙ্ক ক্লিক করার আগে সাবধান হোন। চটকদার শিরোনামের
কোনো অপরিচিত লিঙ্কে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন। কোনো পেজ বা আইডি থেকে গুজব ছড়াতে
দেখলে সেটি রিপোর্ট করুন এবং অন্যদের সতর্ক করুন। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাজনৈতিক
আবেগের বশবর্তী হয়ে যাচাই না করে এবং অফিসিয়াল ঘোষণা ছাড়া কোনো তথ্য বিশ্বাস করা যাবে
না। মনে রাখতে হবে, আমার-আপনার একটি ভুল শেয়ার বা মন্তব্য সমাজে বড়ো ধরনের অস্থিরতা
তৈরি করতে পারে। তাই তথ্য শেয়ার করার আগে অন্তত তিনবার ভাবুন।
গণমাধ্যমের উচিত হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখে দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য
প্রচার করা। গুজব শনাক্ত করে ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করা, খবরের শিরোনামে উত্তেজক
ভাষা পরিহার করার ব্যাপারে যে কোনো গণমাধ্যমকে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা হবে সুনির্দিষ্ট। নিয়মিত ব্রিফিং ও হালনাগাদ তথ্য প্রদান,
নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও যাচাইকৃত সোশ্যাল মিডিয়া সক্রিয় রাখা, গুজব শনাক্তে
মনিটরিং সেল-এর কার্যক্রম জোরদার করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্ব দিতেই হবে।
সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো নিয়মিত তদারকি ও যোগাযোগের মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
থেকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য
ফ্যাক্ট-চেক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় থাকতে হবে জোরালোভাবে। কেননা, গুজবের ক্ষতিকর প্রভাব
অপরিমেয়। গুজব শুধু ভুল তথ্যই নয়, এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি বড়ো হুমকি।
কীভাবে? গুজব ভোটারদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে, ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি কমিয়ে
দেয়, সামাজিক বিভাজন ও উত্তেজনা বাড়ায় এবং নির্বাচন কমিশন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের
ওপর আস্থা ক্ষুণ্ণ করে।
নির্বাচন মানেই মতের পার্থক্য থাকবে, বিতর্ক থাকবে। কিন্তু গুজব
ও মিথ্যা তথ্যের কোনো জায়গা নেই। সচেতন নাগরিক আচরণ, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম এবং কার্যকর
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই পারে একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে।
গুজব রুখে দাঁড়ানো মানে শুধু একটি নির্বাচন নয়- গণতন্ত্রকেই রক্ষা করা। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির
নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়, সেজন্য তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা আমাদের
প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব।