এক সুতোয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী: সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নতুন সমীকরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড কতটা শক্তিশালী, তা নির্ভর করে তার অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সংহতির ওপর। বিশেষ করে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যকার সেতুবন্ধন যখন অটুট থাকে, তখন রাষ্ট্র হয়ে ওঠে অপরাজেয়। মঙ্গলবার (৫ মে) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬-এর একটি বিশেষ অধিবেশনে এই ঐক্যের সুরই প্রতিধ্বনিত হলো। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক উপদেষ্টা ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম স্পষ্ট করেই বললেন, "পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর আস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কই হবে আধুনিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশের মূল ভিত্তি।"
অধিবেশনটি ছিল শুধুই এক আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়, বরং মাঠপর্যায়ের প্রশাসন ও সামরিক নেতৃত্বের এক মেলবন্ধন। উপদেষ্টা তার বক্তব্যে ইতিহাসের পাতা উল্টে মনে করিয়ে দিলেন যে, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর শিকড় মিশে আছে এ দেশের সাধারণ মানুষের আবেগের সাথে। ১৯৭১ সালে একজন সেন কর্মকর্তার স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তিনি বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনের শহীদদের, যাদের আত্মত্যাগ আজকের এই পথচলার প্রেরণা।
সভায় উপস্থিত সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান নিজ নিজ বাহিনীর অবস্থান ও মাঠ প্রশাসনের সাথে সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্যে ফুটে ওঠে এক গভীর প্রত্যয়—সশস্ত্র বাহিনী কেবল যুদ্ধের জন্য নয়, বরং শান্তি ও দুর্যোগে জনগণের পরম বন্ধু হিসেবে পাশে থাকতে বদ্ধপরিকর।
ড. শামছুল ইসলাম সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের চমৎকার একটি অভিধায় ভূষিত করেন—‘Citizens in Uniform’ বা ‘পোশাকধারী নাগরিক’। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, সৈনিকরা ভিনগ্রহের কেউ নন; তারা আমাদেরই সমাজ, পরিবার ও মাটির সন্তান। সাধারণ জীবন ছেড়ে কঠোর শৃঙ্খলা আর ত্যাগের জীবন বেছে নেওয়া এই মানুষগুলো দেশের প্রতিটি সংকটে, হোক তা বন্যা কিম্বা ঘূর্ণিঝড়, সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের এই নিঃস্বার্থ সেবা সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের কাছে এক নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত করেছে।
সরকারের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, আমরা এমন এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই যা হবে ‘Credible Deterrence’ বা বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ। অর্থাৎ, আমাদের সক্ষমতা দেখেই যেন কোনো শত্রু পক্ষ আগ্রাসনের সাহস না পায়। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি জেলা প্রশাসকদের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বা প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের গতিশীলতা ও সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব যখন একসাথে মিলবে, তখন জনকল্যাণ নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অধিবেশনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার নির্যাস ছিল একটাই—উন্নয়ন ও নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা। দিনশেষে, একটি আত্মমর্যাদাশীল ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হিসেবে এই দুই শক্তির ঐক্যবদ্ধ পথচলাই এখন সময়ের দাবি।