মার্কিন ‘গোলামির বাণিজ্য চুক্তিপত্র’-এ আগুন দিলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ইনসাফকায়েমকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতা

 প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০১:৫২ অপরাহ্ন   |   রাজশাহী

মার্কিন ‘গোলামির বাণিজ্য চুক্তিপত্র’-এ আগুন দিলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ইনসাফকায়েমকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতা


চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত ‘গোলামির বাণিজ্য চুক্তিপত্র’-এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে উক্ত চুক্তিপত্রে অগ্নিসংযোগ করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ইনসাফকায়েমকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতা। আজ ১৬ জুন (মঙ্গলবার) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বড় ইন্দারা মোড় স্থানে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে তারা ৩২ পৃষ্ঠার উক্ত বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তিপত্রটি পুড়িয়ে নিজেদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ প্রদর্শন করেন।

​সমাবেশে বক্তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার মাত্র ৩ দিন আগে জনগণের সঙ্গে লুকোচুরি করে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে আমেরিকার সঙ্গে এই চুক্তি সম্পাদন করেছে ইউনূস সরকার। বক্তাদের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে বিদেশীদের সাথে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদী বা গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করার কোনো আইনি বা নৈতিক অধিকার তাদের ছিল না। প্রকৃতপক্ষে এই চুক্তি স্বাধীন বাংলাদেশকে পুনরায় গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র।

​বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, বিশ্বসন্ত্রাসী ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রণীত ‘পাল্টা শুল্কনীতি’ ইতোমধ্যে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘অবৈধ’ বলে বাতিল ঘোষণা করেছে। সুতরাং, সেই বাতিলকৃত নীতির ভিত্তিতে তৈরি এই বাণিজ্য চুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বর্তমান সরকারকে অবিলম্বে দেশের স্বার্থবিরোধী এই চুক্তি বাতিল করার জোর দাবি জানান তারা।

​ধর্মীয় অনুভূতি ও খাদ্য সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরে বক্তারা বলেন, মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআন শরীফে শুকরের গোশত স্পষ্ট হারাম করেছেন। পবিত্র কুরআন শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে— "তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শুকরের গোশত" (সূরা মায়িদা, আয়াত: ০৩)। অথচ এই চুক্তির আওতায় শুকরের গোশতজাত বিভিন্ন খাবার আমদানির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার মধ্যে ব্ল্যাক ফরেস্ট হ্যাম, ব্রাটওয়ার্স্ট, ক্যাপিকোলা, কিয়লবাসা, মর্টাডেলা, প্যানচেটা, প্রসিউটো ও সালামি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এই চুক্তি কার্যকর হলে দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভুতিতে চরম আঘাত লাগবে।

​এছাড়া বক্তারা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের জনগণকে অন্ধকারে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর ও বিষাক্ত জিএমও (জেনেটিক্যালি মডিফাইড) খাবার আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই চুক্তির শর্তানুযায়ী, আমেরিকা থেকে জিএমও খাবার আমদানি করলে তার জন্য বাংলাদেশ আলাদা কোনো পরিচিতি বা লেবেল চিহ্নিত করতে পারবে না, যার ফলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিকর খাবার চিনে বর্জন করতে পারবে না। বক্তারা দাবি করেন, জিএমও খাবার খেলে নিশ্চিত ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শুধু তাই নয়, আমেরিকা তাদের খাবারের যে ‘হালাল সনদ’ দেবে, সেটিই বাংলাদেশকে অন্ধভাবে মেনে নিতে হবে, যার ফলে দেশের মানুষ হালাল-হারাম খাবার আলাদা করে যাচাই করার সুযোগ হারাবে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী বার্ড ফ্লু রোগ ধরা পড়লেও সেখান থেকে মুরগি বা ডিম আমদানি চালিয়ে যেতে বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে। সোজা ভাষায়— আমেরিকা যদি বাংলাদেশের জনগণকে বিষও দেয়, তবে এ চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশের মানুষকে চোখ বন্ধ করে তা খেতে হবে।

​অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে সমাবেশে বলা হয়, চুক্তির সময় দাবি করা হয়েছিল এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, গত ৪ মাসে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশের আমদানি ১০০% বৃদ্ধি পেলেও, বিপরীতে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৩% (তথ্যসূত্র: দৈনিক ইনকিলাব, ১১ মে ২০২৬)।

​সমাবেশে বক্তারা বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, দলটির পররাষ্ট্রনীতিতে বলা হয়েছিল— "পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে..."। কিন্তু বর্তমান বাণিজ্য চুক্তি উক্ত ইশতেহারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যে নির্বাচনী ইশতেহার জনগণের সামনে প্রদর্শন করে তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে, তা অবশ্যই তাদের রক্ষা করতে হবে। তাই অবিলম্বে সরকারকে এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করার আহ্বান জানানো হয়। একই সাথে, দেশবিরোধী চুক্তি করার দায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ইউনূস ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খলিলকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তারা এবং শরিয়ত অনুযায়ী দেশদ্রোহী অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন।

​সমাবেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানদের উপর নির্যাতন বন্ধের জোর দাবি জানানো হয়। বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের উপর নির্যাতন বন্ধ না করলে, বাংলাদেশের ৫০ কোটি, ভারতের ৪০ কোটি এবং পাকিস্তানের ৩৫ কোটি মুসলমান একত্রে মিলে ইনশাআল্লাহ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

​মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি সমাবেশ থেকে আরও ৩টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়:

১. বাংলাদেশের যে সকল হোটেল-রেস্তোরাঁয় ‘নো-বিফ’ (No-Beef) চিহ্ন ঝুলছে, সে সব হোটেল-রেস্তোরাঁ অবিলম্বে বন্ধ করে প্রতিটি হোটেল-রেস্তোরাঁয় বাধ্যতামূলক গরুর গোশত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

২. দেশের নওমুসলিমদের (নবদীক্ষিত মুসলিম) রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।

৩. পার্বত্য চট্টগ্রামে মসজিদ নির্মাণে যে সকল উপজাতি সন্ত্রাসী বাধা প্রদান করছে, তাদেরকে অবিলম্বে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

​উক্ত প্রতিবাদ সমাবেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ইনসাফকায়েমকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সহস্রাধিক নেতা-কর্মী ও সাধারণ জনগণ উপস্থিত ছিলেন।


Advertisement
Advertisement
Advertisement