সংবাদ শিরোনাম

সড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল, ৭ জেলায় ঝরল ১২ প্রাণ: ঈদযাত্রায় বিষাদের ছায়া

 প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ০৭:৪৪ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

সড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল, ৭ জেলায় ঝরল ১২ প্রাণ: ঈদযাত্রায় বিষাদের ছায়া

অনলাইন ডেস্ক:

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই নাড়ির টানে চেনা আঙিনায় ফিরে প্রিয়জনদের সঙ্গে মেলবন্ধন। কিন্তু সেই চিরচেনা আনন্দের আবহকে ম্লান করে দিয়ে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন আবার এক একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। উৎসবের ঠিক আগমুহূর্তে ঈদযাত্রার চিরচেনা ব্যস্ততার মাঝেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দেশের সাতটি জেলায় গত মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত বারো জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার ফলে বহু পরিবারে ঈদের অনাবিল আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নিয়েছে আজীবন কান্নার মাতমে। সিরাজগঞ্জ, বরিশাল, সাতক্ষীরা, খুলনা, ফরিদপুর, জামালপুর ও চাঁদপুরের পিচঢালা পথগুলো রক্তে রঞ্জিত হওয়ার এই ঘটনা দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার চিরন্তন দুর্বলতা ও চালকদের বেপরোয়া মনোভাবকে আবারও উলঙ্গ করে দেখিয়েছে।

এই রক্তক্ষয়ী উৎসব-যাত্রার সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্যটি মঞ্চস্থ হয়েছে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানাধীন সিআরবিসি এলাকায়। ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা, চারদিকে যখন ঘরে ফেরার তাড়া, ঠিক তখনই একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে। বাসের প্রচণ্ড ধাক্কায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় অটোরিকশাটি, আর তার ভেতরে থাকা তিনজন পুরুষ যাত্রী ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ঘটনার আকস্মিকতায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সলঙ্গা থানা-পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসলাম আলী ও হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসেন। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মহাসড়কে প্রাণ হারানো এই তিন হতভাগ্য পুরুষের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, যা তাদের পরিবারের অপেক্ষাকে আরও বেশি দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক করে তুলেছে।

একই দিনে আরও এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়েছে বরিশাল। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর এলাকায় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একটি বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় ধূলিসাৎ হয়ে গেছে গোটা একটি পরিবার। উজিরপুর উপজেলা সদরের বাসিন্দা ফিরোজ মাহমুদ পেশাগত কারণে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে পরিবার নিয়ে ঢাকাতে থাকতেন। ঈদের ছুটিতে নিজের মোটরসাইকেলে করে স্ত্রী মনিয়া বেগম এবং শিশুকন্যা জান্নাতকে নিয়ে তিনি ফিরছিলেন চিরচেনা গ্রামের বাড়িতে। মহাসড়কে তীব্র যানজট থাকায় ফিরোজ তার মোটরসাইকেলটি রাস্তার পাশে সাবধানে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে, বরিশালগামী ‘তাজ আনন্দ পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস সব নিয়মকানুন উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। বাসের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ফিরোজ, তার স্ত্রী ও অবুজ শিশু সন্তান। একটি সাজানো গোছানো পরিবার চোখের পলকে চিরতরে বিলীন হয়ে যাওয়ার এই দৃশ্য দেখে ক্ষুব্ধ জনতা ঘাতক বাসটিতে ভাঙচুর চালায়, যার ফলে মহাসড়কে প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে গৌরনদী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মো. মিজানুর রহমান এবং গৌরনদী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহসীন ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং বাসটিকে জব্দ করেন, যদিও চালক ও হেলপার ততক্ষণে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

এদিকে ভোরের আলো ফুটতেই সাতক্ষীরার খুলনা-পাইকগাছা সড়কের তেতুলিয়া জামে মসজিদের সামনে ঘটে যাওয়া আরেকটি দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে দুই তরতাজা যুবকের প্রাণ। সম্পর্কে চাচাতো ভাই তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের প্রসাদপুর গ্রামের নাসিম আলী ফকির ও মেহেদী হাসান ফকির মোটরসাইকেলে করে চুকনগরের দিকে যাচ্ছিলেন। সকাল ৬টার দিকে একটি দ্রুতগামী পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলেই চালক নাসিমের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ছোট ভাই মেহেদীকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তিনিও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একই ঘরের দুই সন্তানের এমন অকাল প্রয়াণে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের স্তব্ধতা। তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, পুলিশ মরদেহ দুটি উদ্ধার করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

উচ্ছ্বাস ও বিষাদের এই দোলাচলের মধ্যে খুলনার কয়রায় ঈদের আনন্দ বিষাদে রূপ নিয়েছে এক পশুব্যবসায়ী পরিবারে। কোরবানির পশু বহনকারী একটি নসিমন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে মিজানুর রহমান নামে এক ওষুধ ব্যবসায়ী নিহত হন। মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার বাগালী ইউনিয়নের ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় মিজানুরের সাত বছরের শিশুপুত্র হাবিবসহ আরও তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহ আলম এবং কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সুজিত কুমার বৈদ্য জানান, আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশু হাবিবকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে, এবং এই দুর্ঘটনা পুরো গ্রামের ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে।

এছাড়া ভোরের কুয়াশা ও অসচেতনতার সুযোগে ফরিদপুর এবং জামালপুরে ঝরে গেছে দুটি নারী প্রাণ। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ফরিদপুর সদরের ব্রাহ্মণকান্দা বাজার এলাকায় ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রাস্তা পার হওয়ার সময় অজ্ঞাত একটি দ্রুতগামী গাড়ি মিম খাতুন নামের এক নারীকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। করিমপুর হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেন জানান, ঘাতক গাড়িটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, সকাল ৬টার দিকে জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ছোট জয়রামপুর এলাকায় বালুবাহী ড্রামট্রাক ও পিকআপভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষের মাঝে পড়ে রত্না ভানু নামের এক মানসিক ভারসাম্যহীন পথচারী নারী প্রাণ হারান। জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, পিবিআইয়ের সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।


একই দিনে শিশুদের জন্য সড়ক কতটা অনিরাপদ, তার প্রমাণ মিলেছে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে। রামগঞ্জ সড়কের অনি-রনি ব্রিকস্-এর সামনে সকালে নানিকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আট বছরের শিশু মিম আক্তার। স্থানীয় মাদরাসার তৃতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থীটি হুট করে রাস্তা পার হতে গেলে একটি দ্রুতগামী ট্রাক তাকে চাপা দেয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। হাজীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান জানান, ঘাতক ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে এবং শিশুটির মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

এভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রতিবছর ঈদের আগে মহাসড়কগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা নিরাপত্তার গালভরা আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ থাকে নগণ্য। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সবিহীন ও ক্লান্ত চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং সাধারণ পথচারীদের অসচেতনতা—সব মিলিয়ে সড়কগুলো আজ কসাইখানায় পরিণত হয়েছে। এই মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে না পারলে, সাধারণ মানুষের জন্য উৎসবের আনন্দ কখনোই নিরাপদ এবং অর্থবহ হয়ে উঠবে না।