সংবাদ শিরোনাম

ঈদের আনন্দ বনাম জীবনের ঝুঁকি: মহাসড়কে কমেনি ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফেরার বিপজ্জনক প্রবণতা

 প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ০৬:৫৮ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

ঈদের আনন্দ বনাম জীবনের ঝুঁকি: মহাসড়কে কমেনি ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফেরার বিপজ্জনক প্রবণতা

প্রতিবেদক | ঢাকা

পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। রাজধানী ঢাকা ছেড়ে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে লাখো মানুষ। কিন্তু এই আনন্দের যাত্রাই অনেকের জন্য হয়ে উঠছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তীব্র পরিবহন সংকট এবং আকাশচুম্বী বাস ভাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ বাধ্য হয়েই বেছে নিচ্ছেন মালবাহী ট্রাক বা পিকআপ ভ্যান। জীবনের ঝুঁকি থাকার পরও গাদাগাদি করে এসব ট্রাকে চড়ে ঢাকা ছাড়ছেন হাজার হাজার যাত্রী। ঢাকার প্রধান প্রবেশদ্বার গাবতলী ও আমিনবাজার ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় বর্তমানে এমন চিত্রের নিয়মিত দেখা মিলছে। গাবতলীর গরুর হাটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা যেসব ট্রাক গরু নামিয়ে খালি ফিরে যাচ্ছে, সেগুলোই এখন হয়ে উঠেছে দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহনের সস্তা মাধ্যম।

আমিনবাজার ব্রিজের ওপর সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের সামনে গিয়ে দেখা যায় চিরচেনা সেই ভিড়। ট্রাকের হেলপার ও কন্ট্রাক্টররা গলা ফাটিয়ে হাঁক ছাড়ছেন, ‘রংপুর ছয়শ, রংপুর ছয়শ’। এমন ডাক শুনেই জটলার মধ্য থেকে ব্যাগ কাঁধে ট্রাকে উঠে পড়লেন ঢাকার মিরপুরের একটি ছোট পোশাক কারখানার কর্মী জাকির হোসেন। অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বাসের টিকিট কাটার সামর্থ্য নেই বলেই তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন। জাকির জানান, কাউন্টারে গিয়ে টিকিটের দাম শুনে তার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। গাবতলী থেকে রংপুরের স্বাভাবিক ভাড়া যেখানে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, সেখানে ঈদুল আজহার সুযোগ নিয়ে একেকটি টিকিটের দাম চাওয়া হচ্ছে ১৯০০ টাকা। কোনো কোনো কাউন্টারে ১৬০০ টাকার নিচে কথাই বলছে না। জাকিরের আক্ষেপ, সামান্য বেতনের চাকরি করে যদি ১৯০০ টাকা শুধু বাস ভাড়াই দিয়ে দেন, তবে গ্রামের বাড়িতে অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা আর সন্তানদের জন্য ঈদের কেনাকাটা করবেন কীভাবে? তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই অর্ধেকেরও কম খরচে ট্রাকে চেপেছেন তিনি।

একই ট্রাকে পরিবার নিয়ে চড়ে বসেছেন হামিদ শেখ। সঙ্গে তার স্ত্রী ও দুই সন্তান, গন্তব্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গাবতলী বাস টার্মিনালে এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ঘুরেও চারটি সিট একসঙ্গে পাননি তিনি। কোথাও দুটি সিট খালি থাকলেও দাম চাওয়া হচ্ছিল দ্বিগুণেরও বেশি। শেষমেশ কোনো উপায় না দেখে সন্তানদের হাত ধরে ট্রাকে উঠে পড়েন। ট্রাকের ওপর টাঙানো পলিথিন ও ত্রিপলের ছাউনি দেখিয়ে হামিদ শেখ নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন যে, অন্তত বৃষ্টি এলে তারা ভিজবেন না। তবে দুর্ঘটনার ভয় যে তার মনে নেই, তা কিন্তু নয়। গত সোমবার সকালে গাজীপুর থেকে নওগাঁগামী একটি রডবোঝাই ট্রাক টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গিয়ে ১৫ জন যাত্রী ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। চলতি ঈদযাত্রায় এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় এবং হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। হামিদ শেখ সেই দুর্ঘটনার খবর জানেন, কিন্তু তার অসহায় সুর, ‘বাড়ি তো যেতেই হবে ভাই। আল্লাহর নাম নিয়ে রওনা দিয়েছি, বাকিটা উনার ইচ্ছা।’

যাত্রী তোলার বিষয়ে ট্রাকচালকদেরও রয়েছে নিজস্ব যুক্তি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গরু নিয়ে আসা এক ট্রাকচালক জানান, এত দূর থেকে ঢাকায় আসার পর খালি গাড়ি নিয়ে ফিরে গেলে তেলের খরচ চালানোই দায় হয়ে পড়ে। মালিককে জবাবদিহি করতে হয়। তাই ফেরার পথে কিছু যাত্রী তুললে ডিজেলের খরচটা উঠে আসে, আবার গরিব মানুষগুলোও কম টাকায় বাড়ি ফিরতে পারে। চালকদের এই যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে মানবিক মনে হলেও এর পেছনের আইনি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি অত্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশে পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৩৪(২) ধারা অনুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই পণ্যবাহী গাড়িতে মানুষ পরিবহন করা যাবে না। যদি কোনো চালক বা মালিক এই আইন অমান্য করেন, তবে আইনের ১০২ ধারা মোতাবেক অনধিক এক মাসের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চৌকি বসালেও উৎসবের এই মৌসুমে যাত্রী ও চালকদের এমন গোপন সমঝোতা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে। আমিনবাজার বা গাবতলীর মূল পয়েন্ট পেরিয়ে একটু সামনে গিয়েই ট্রাকগুলো যাত্রী তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ বা জরিমানা করে এই বিপজ্জনক প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত ঈদযাত্রায় পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সস্তায় বাড়ি ফিরতে গিয়ে এভাবে নিজেদের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে বাধ্য হবে। প্রতিটি ঈদেই এমন অসচেতনতা আর অব্যবস্থাপনার কারণে বহু পরিবারের ঈদের আনন্দ চিরতরে বিষাদে পরিণত হয়, যার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনের আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপের বিকল্প নেই।