ঈদযাত্রায় থমকে গেছে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক: ৪০ কিলোমিটার যানজটে লাখো মানুষের চরম ভোগান্তি
কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি:
পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে মানুষ। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও শেষ মুহূর্তের এই ঘরমুখো মানুষের ঢল রূপ নিয়েছে এক দুঃস্বপ্নে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ যানজট। গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস থেকে শুরু করে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখন কেবলই যানবাহনের স্তব্ধ সারি। উত্তরবঙ্গগামী লাখো মানুষের ঈদযাত্রা থমকে গেছে পিচঢালা এই সড়কে, যেখানে আনন্দের পরিবর্তে এখন কেবলই অপেক্ষা আর ক্লান্তির দীর্ঘশ্বাস।
ভোগান্তির এই মহাকাব্য শুরু হয় মূলত গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকেই। ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিশাল শিল্পাঞ্চলগুলোতে ঈদের ছুটি ঘোষণা হতেই লাখ লাখ শ্রমিক ও চাকুরিজীবী একসঙ্গে রওনা হন প্রিয়জনদের টানে। আকস্মিক এই মানবস্রোতের সঙ্গে দূরপাল্লার বাস, কোরবানির পশুবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। ফলে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার চন্দ্রা ত্রিমোড়, সফিপুর, কালিয়াকৈরের চন্দ্রা, গোড়াই ও মির্জাপুর অংশে যানবাহনের চাকা একপ্রকার থমকে যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে, যা একপর্যায়ে রূপ নেয় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিশাল অচলাবস্থায়। অনেক জায়গায় পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, যানবাহনগুলো এক ঘণ্টায় এক কিলোমিটার পথও অতিক্রম করতে পারেনি।
এই দীর্ঘ যানজটের সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রকৃতির বৈরিতা। থেমে থেমে আসা বৃষ্টি আর ভ্যাপসা গরমে বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরম সীমায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকায় তীব্র হয়ে উঠেছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। সড়কের পাশে কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় দীর্ঘ পথযাত্রায় নারীদের পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় কষ্ট। এর ওপর কিছু অসাধু পরিবহন মালিক ও চালকের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ-ত্রিগুণ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে, যা সাধারণ যাত্রীদের ক্ষোভ ও অসহায়ত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চন্দ্রা এলাকায় আটকে থাকা এক বাসচালক জানান, সন্ধ্যার পর থেকে গাড়ির যে চাপ শুরু হয়েছে, তা সামাল দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। চোখের সামনে মাইলের পর মাইল কেবল গাড়ি আর গাড়ি। বাসের ভেতরে যাত্রীরা ক্লান্তিতে ঝিমোচ্ছেন, অথচ গাড়ি এক ইঞ্চিও নড়ানোর উপায় নেই। যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল পৌঁছাতে যেখানে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে মঙ্গলবার রাতের এই যানজটে পড়ে একই পথ পাড়ি দিতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এই বিলম্বের কারণে অনেকেই নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দিনের বেলায় মির্জাপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও রাত ৯টার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। কালিয়াকৈর থেকে মির্জাপুর অংশে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার ধাক্কা গিয়ে লাগে যমুনা সেতুর পূর্ব টোল প্লাজা পর্যন্ত। এলেঙ্গা থেকে সেতু পর্যন্ত পুরো পথেই সারারাত থেমে থেমে গাড়ি চলেছে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যানবাহন বিকল হয়ে পড়া এবং চালকদের প্রতিযোগিতা করে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর প্রবণতা এই যানজটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গাজীপুর হাইওয়ের পুলিশ সুপার রহমত উল্লাহ জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে শেষ মুহূর্তে হঠাৎ করে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং মহাসড়ক সচল করতে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মহাসড়কের ওপর যেন কোনো গাড়ি বিকল হয়ে দীর্ঘক্ষণ পড়ে না থাকে সেজন্য রেকার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তারা আশা করছেন, দুপুরের পর থেকে গাড়ির চাপ কিছুটা কমলে এবং পুলিশি তৎপরতা আরও জোরদার হলে যান চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রূপ ফিরে পাবে। তবে ততক্ষণে লাখো মানুষের ঈদের আনন্দ এই অন্তহীন অপেক্ষার প্রহরে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।