সংবাদ শিরোনাম

রাজনীতি ও নির্বাচনী আমেজে মুখর ঈদুল আজহা: তৃণমূল চাঙ্গা, অর্থের হাতবদলে চাঙা গ্রামীণ অর্থনীতি

 প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ১০:১০ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

রাজনীতি ও নির্বাচনী আমেজে মুখর ঈদুল আজহা: তৃণমূল চাঙ্গা, অর্থের হাতবদলে চাঙা গ্রামীণ অর্থনীতি

​বিশেষ প্রতিবেদক:

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা ঘিরে এবার সারা দেশের গ্রামীণ জনপদে বইছে ভিন্ন এক হাওয়া। নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এটি দ্বিতীয় ঈদ হলেও, সামনেই কড়া নাড়ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিতব্য সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবার ঈদের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে মফস্বলের হাট-ঘাট-মাঠ। উৎসবের এই আবহে একদিকে যেমন তৃণমূলের রাজনীতি চাঙ্গা হচ্ছে, অন্যদিকে নেতাদের কোরবানি ও আর্থিক অনুদানের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব গতিশীলতা তৈরি হয়েছে।

​বিগত ১২ ফেব্রুয়ারির অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের পর প্রথম ঈদুল ফিতরটি ক্ষমতাসীন দল বিএনপি উদযাপন করেছিল বেশ ফুরফুরে মেজাজে। তবে এবারের ঈদুল আজহার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ঈদের মাত্র কয়েক মাস পরেই শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মহারণ। আর এই নির্বাচনকে সামনে রেখেই এবার মন্ত্রী-এমপি ও মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিজ নিজ এলাকায় ঈদ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচনী এলাকায় হেভিওয়েট নেতাদের এই উপস্থিতি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে বাড়তি উদ্দীপনা জোগাচ্ছে। ঈদের চিরচেনা শুভেচ্ছা বিনিময় ও কোশল ফাঁকা আওয়াজের বদলে এবার রূপ নিয়েছে পুরোদস্তুর নির্বাচনী জনসংযোগে। হাট-বাজার ও মোড়ে মোড়ে শোভা পাচ্ছে রঙ-বেরঙের ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন, যেখানে সম্ভাব্য প্রার্থীরা পবিত্র ঈদের দোয়ার পাশাপাশি পরোক্ষভাবে নিজেদের প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন।

​প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতিমধ্যেই সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে জনগণের পাশে থেকে ঈদ উদযাপনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। বিগত দেড় দশকে মামলা, হামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে যেসব তৃণমূল নেতাকর্মী স্বাভাবিকভাবে ঈদ করতে পারেননি, এবার তাদের বিশেষ খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় নেতারা এলাকায় গিয়ে শুধু উৎসবের আনন্দই ভাগ করে নিচ্ছেন না, বরং গত তিন মাসে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং নির্বাচনকালীন দেওয়া প্রতিশ্রুতির কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরছেন। জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু যেমনটি জানিয়েছেন, নাটোরে নিজ এলাকায় ঈদ উদযাপনের পাশাপাশি তিনি সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জনগণের সামনে ব্যাখ্যা করবেন এবং একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে চালানো বিভিন্ন অপপ্রচারের জবাব দেবেন। মূলত প্রতিপক্ষ জামায়াত ও এনসিপির ‘বিএনপি সংস্কার বিরোধী ও বিদেশী শক্তির অনুগত’—এমন প্রচারণার বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক করতে ক্ষমতাসীন দল এবার ঈদকে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে।

​অন্যদিকে, সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি) ঘরের মাঠে ক্ষমতাসীনদের একটুও ছাড় দিতে নারাজ। জামায়াত তো ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিল। দলটির নায়েব আমির মাওলানা এ জে এম শামসুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মতো শীর্ষ নেতারা মাঠপর্যায়ে রোকন সম্মেলন ও জনসভা করে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন পৌরসভা ও উপজেলায় প্রার্থী তালিকা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে দলটি। জামায়াত নেতারা ঈদকে কেন্দ্র করে গণসংযোগে নেমে সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছেন, স্থানীয় নির্বাচন যেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়, অন্যথায় রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

​এদিকে জামায়াতের পাশাপাশি এনসিপিও বেশ সরব ভূমিকা পালন করছে। দলটির ৮ জন এমপিসহ শীর্ষ নেতারা ইতিমধ্যেই নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করছেন। নিজস্ব বড় কোনো ভোটব্যাংক না থাকলেও এবং গত জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের ভোটে ৬ জন এমপি নির্বাচিত হলেও, তারা এককভাবে ১০টি সিটি কর্পোরেশন ও ১০০টি উপজেলায় প্রার্থী ঘোষণা করে চমক দিয়েছে। ঈদের পর আরও ২০০ উপজেলায় প্রার্থী দেওয়ার কথা রয়েছে দলটির। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির এই একক প্রার্থী ঘোষণার মূল কৌশল হলো ভবিষ্যতে স্থানীয় নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির ক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে দরকষাকষির জায়গাটি শক্ত করা। তবে শেষ পর্যন্ত বড় বড় পৌরসভা ও উপজেলায় জামায়াত-এনসিপি সমঝোতার ভিত্তিতেই মাঠে নামতে পারে।

​রাজনৈতিক এই জমজমাট পরিস্থিতির সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে, বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে মন্ত্রী-এমপি ও বিত্তবান রাজনৈতিক নেতারা বিপুল পরিমাণে কোরবানির পশু কিনছেন, যার ফলে স্থানীয় পশুর হাটগুলোতে কেনাবেচা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। শুধু কোরবানিই নয়, ঈদ সালামি, বখশিস, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ এবং তৃণমূলের কর্মীদের বিশেষ আর্থিক সহায়তার কারণে গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক অর্থের হাতবদল হচ্ছে। ফলে মুদি দোকান থেকে শুরু করে পরিবহন খাত—সবখানেই এক ধরনের চাঙ্গা ভাব বিরাজ করছে। রাজনীতির এই উৎসবমুখর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আবহে এবারের ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা হয়ে উঠেছে আগামী দিনের ক্ষমতার সমীকরণ মেলানোর এক মহোৎসব।