সংবাদ শিরোনাম

লাম্পি স্কিনের ক্ষত ও লোকসানের ক্ষতচিহ্ন: রাজশাহীর চামড়া বাজারে এবার ৪০ শতাংশ বাতিলের শঙ্কা

 প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

লাম্পি স্কিনের ক্ষত ও লোকসানের ক্ষতচিহ্ন: রাজশাহীর চামড়া বাজারে এবার ৪০ শতাংশ বাতিলের শঙ্কা

​রাজশাহী থেকে বিশেষ প্রতিবেদন:

ঈদুল আজহার আনন্দ আর ত্যাগের মহিমার আড়ালে রাজশাহীর চামড়া ব্যবসায়ীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। গত কয়েক বছরের টানা লোকসান, পুঁজি সংকট আর আড়তদারদের বকেয়া টাকা না পাওয়ার ক্ষতের ওপর এবার নতুন ‘নুন’ হয়ে দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর সংক্রামক রোগ ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি)। এই রোগের কারণে কোরবানির পশুর চামড়ায় গুটি, ক্ষত আর ভেতরে ফুলে যাওয়ার মতো গুরুতর সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের আশঙ্কা, এই রোগাক্রান্ত পশুর চামড়া ট্যানারি মালিকরা কোনোভাবেই গ্রহণ করবেন না। ফলে আসন্ন ঈদে সংগৃহীত প্রতি ১০০টি চামড়ার মধ্যে অন্তত ৪০টিই সরাসরি বাতিল বা রিজেক্ট হয়ে যাওয়ার তীব্র শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

​কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দরপতন এবং দেশের ভেতরে সাভার ট্যানারি পল্লীর অব্যবস্থাপনার কারণে এমনিতেই ধুঁকছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই রপ্তানি খাত। এর ওপর রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগরীর পশুর হাটগুলো ঘুরে দেখা গেছে এক চাপা উৎকণ্ঠা। রোগাক্রান্ত চামড়ার ঝুঁকির কারণে এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চরম সতর্কাবস্থা অবলম্বন করছেন। বিগত বছরগুলোতে ঈদের দিন পাড়া-মহল্লা থেকে যারা উৎসাহ নিয়ে চামড়া সংগ্রহ করতেন, তাদের অনেকেই এবার পুঁজি হারানোর ভয়ে পুরোপুরি মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। আর যারা নামছেন, তারা অত্যন্ত কম পুঁজি নিয়ে এবং দেখে-শুনে পা ফেলছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঈদের দিন তারা ধার-দেনা করে বেশি দামে চামড়া কিনলেও আড়ত বা ট্যানারিতে গিয়ে সেই ন্যায্য দাম মেলে না। এর সঙ্গে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ, শ্রমিকের মজুরি এবং লবণের চড়া দাম যোগ হয়ে প্রতিবারই তাদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। প্রান্তিক এসব ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি, সরকার যদি সিন্ডিকেট ভেঙে সরাসরি তাদের কাছ থেকে চামড়া কেনার ব্যবস্থা করত, তবে চামড়া শিল্পের এই বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হতো।

​ব্যবসায়ীদের এই আশঙ্কার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি লুৎফর রহমান। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানান যে, ল্যাম্পি স্কিন রোগের কারণে এবার পশুর শরীরে দৃশ্যমান দাগ ও গভীর ক্ষত রয়েছে। চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ট্যানারিগুলো এই চামড়া একদমই নেবে না কিংবা নিলেও নামমাত্র দাম দেবে। তাই এবার চামড়া কেনার সময় ব্যবসায়ীদের চোখ-কান খোলা রেখে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে, নতুবা চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত বড় একটি অংশ দেউলিয়া হয়ে যাবে। যদিও রাজশাহী জেলায় এবারও কোটি টাকার ওপর চামড়া বেচাকেনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তবে এই বিশাল বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে এবং প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে সরকারের মাঠপর্যায়ে কঠোর ও কার্যকর তদারকি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

​অবশ্য মাঠপর্যায়ের এই চরম আতঙ্কের বিপরীতে কিছুটা আশার বাণী শুনিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান জানান, বিগত বছরের তুলনায় এবার ল্যাম্পি স্কিন রোগের প্রকোপ অনেকটাই কম। গত বছর এই রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক না থাকায় সংক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। তবে এবার সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়েছে। অবশ্য তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, রোগটি সমাজ থেকে একেবারে নির্মূল হয়ে যায়নি। তাই এই সংকট এড়াতে তিনি সাধারণ ক্রেতা ও কোরবানিদাতাদের হাটে গিয়ে দেখেশুনে সম্পূর্ণ সুস্থ ও সবল পশু কেনার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে চামড়ার বাজারে এর ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে।

​এদিকে সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার এবার কোরবানির পশুর চামড়ার নতুন দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম গত বছরের চেয়ে দুই টাকা বাড়িয়ে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা করা হয়েছে, আর ঢাকার বাইরে এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে Sixty-two টাকা। এছাড়া দেশব্যাপী খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সরকারি এই মূল্যতালিকা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়ে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের মনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ প্রতি বছরই লবণের কৃত্রিম সংকট এবং আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কারণে নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন প্রান্তিক সংগ্রাহকরা।

​চামড়া খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর সঠিক সংরক্ষণ। গরমের তীব্রতার কারণে পশু জবাইয়ের পর মাত্র আট থেকে দশ ঘণ্টার মধ্যে যদি চামড়ায় পর্যাপ্ত লবণ দেওয়া না যায়, তবে তা দ্রুত পচতে শুরু করে। আর ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলে সেই চামড়া সম্পূর্ণ অনুৎপাদক ও মূল্যহীন হয়ে পড়ে। অতীতে দেশের মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো চামড়া সংগ্রহের পর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তা লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করত, যা তাদের আয়ের অন্যতম বড় উৎস ছিল। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিক লোকসানের পিঠে এবার ল্যাম্পি স্কিন রোগের উপদ্রব যুক্ত হওয়ায় অনেক ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান চামড়া সংগ্রহের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এই বিপর্যয় সামাল দিতে এবং চামড়া পচন রোধে সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে সারাদেশে প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ বিতরণ করা হয়েছে, যার সুফল রাজশাহী মহানগর ও জেলার নয়টি উপজেলাতেও পৌঁছেছে।

​চলতি বছর ঈদুল আজহায় রাজশাহী জেলায় মোট কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৮টি। পশুর এই বিপুল সংখ্যার বিপরীতে চামড়া সংরক্ষণের সব প্রস্তুতি থাকলেও, রোগাক্রান্ত পশুর চামড়া বাতিলের যে খাঁড়া ঝুলছে, তা মোকাবিলা করাই এখন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত ল্যাম্পি স্কিনের ক্ষত এড়িয়ে রাজশাহীর চামড়া শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারে কি না, নাকি লোকসানের বোঝা আরও ভারী হয়, তা দেখার জন্য ঈদের পরবর্তী দিনগুলোর দিকেই তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।