রক্তাক্ত মহাসড়ক: নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার আনন্দ বিষাদে রূপ নিল ২৭ পরিবারে
বিশেষ প্রতিবেদক:
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র দুই দিন বাকি। ঘরমুখো মানুষের স্রোত নেমেছে দেশের প্রতিটি মহাসড়কে। আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিয়ে নাড়ির টানে মানুষ ফিরছিল চেনা ঠিকানায়, আপনজনদের সান্নিধ্যে। কিন্তু এক নিমেষেই সেই আনন্দ রূপ নিল এক চরম বিষাদে। চিরচেনা চিরন্তন উৎসবের আনন্দকে ম্লান করে দিয়ে সোমবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঝরে গেল ২৭টি তাজা প্রাণ। উৎসবের আগের এই বিভীষিকাময় দিনে সড়ক যেন এক রক্তক্ষয়ী মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। পরিবহন সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এড়ানোর মরিয়া চেষ্টা এবং চালকদের বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের নির্মম খেসারত দিতে হলো নিরীহ সাধারণ মানুষকে। একদিনে দেশের ছয়টি জেলায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি নেমে আসে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে।
সোমবারের সবচেয়ে বড় এবং মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে ভোর রাতে, যখন পুরো দেশ গভীর ঘুমে মগ্ন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিহাতি উপজেলার সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে যাওয়ার পর ঘটনাস্থলেই ১৫ জন শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু হয়। ঈদের মহাসড়কে নিয়মিত গণপরিবহনের অতিরিক্ত ভাড়া ও আসন সংকটের কারণে এই হতভাগ্য যাত্রীরা নিজেদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে কম খরচে বাড়ি ফেরার আশায় রডবোঝাই ওই ট্রাকে উঠেছিলেন। কিন্তু ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং ট্রাকটি মহাসড়কের পাশের একটি গভীর খাদে উল্টে পড়ে। ট্রাকের ওপরে থাকা যাত্রীরা ভারী রডের নিচে চাপা পড়ে পিষ্ট হন। অন্ধকারের মধ্যেই শুরু হয় আর্তনাদ, যা কিছুক্ষণের মধ্যেই স্তব্ধ হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালালেও ততক্ষণে ১৫ জনের প্রাণপ্রদীপ নিভে গেছে। এই ঘটনায় আহত হন আরও অন্তত ছয়জন। দুর্ঘটনার পরপরই চালক ও তার সহকারী পালিয়ে যায়, যা দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার এক চরম নৈরাজ্যকে আবারও সামনে এনেছে। জেলা প্রশাসন নিহতদের পরিবারকে দাফন ও শেষকৃত্যের জন্য সামান্য কিছু আর্থিক অনুদান দিলেও, পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষদের হারিয়ে স্বজনদের কান্না যেন কোনো সান্ত্বনাই মানছে না।
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বগুড়ার সড়কও এদিন রক্তাক্ত হয়েছে দুটি ভিন্ন দুর্ঘটনায়। বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কে একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান মা জেসমিন খাতুন ও তার মেয়ে তণু আক্তার। কাজীপাড়া এলাকায় ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় অটোরিকশাচালকও গুরুতর আহত হন। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বনানী এলাকায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ঘটে আরেক হৃদয়বিদারক ঘটনা। রংপুর থেকে মোটরসাইকেলে করে সপরিবারে পাবনার গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন আনিছুর রহমান। কিন্তু একটি অজ্ঞাত দ্রুতগামী যানবাহন তাদের মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। মহাসড়কের পিচঢালা রাস্তায় ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আনিছুর রহমান এবং তার মাত্র চার বছর বয়সী শিশুকন্যা পুষ্প। গুরুতর আহত অবস্থায় আনিছুরের স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও, তার পুরো পরিবার নিমেষেই ধ্বংস হয়ে গেল।
একইভাবে কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলেও ঈদের আনন্দ এক লহমায় ফিকে হয়ে গেছে এক পরিবারের সবাইকে হারিয়ে। ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কের মিঠামইন উপজেলার কাস্তল এলাকায় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বেপরোয়া পিকআপভ্যান একটি মোটরসাইকেলকে পিষে দেয়। এতে মোটরসাইকেলে থাকা মনির হোসেন, তার স্ত্রী মুন্নি আক্তার এবং তাদের মাত্র ছয় বছরের নিষ্পাপ সন্তান আয়ান ঘটনাস্থলেই মারা যান। একটি সাজানো গোছানো পরিবার এভাবে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ায় গোটা এলাকায় এখন শোকের ছায়া। চালক পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও স্থানীয় জনতা পিকআপভ্যানটি আটকে সক্ষম হয়।
দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশপথগুলোতেও মৃত্যুর এই মিছিল থেমে ছিল না। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ওপর দিয়ে যাওয়া বগুড়া-নগরবাড়ি মহাসড়কে পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে দিলরুবা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে লবণবোঝাই ভটভটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে সারা খাতুন নামের এক তরুণী নিহত হন। এর কিছু সময় পর একই মহাসড়কের গাড়াদহ ইউনিয়নের মশিপুর গুচ্ছ গ্রাম এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় সিমেন্টবোঝাই একটি দ্রুতগামী ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে আহম্মদ নামের এক শিশু ঘটনাস্থলেই মারা যায়। হাইওয়ে পুলিশ ঘাতক যানবাহনগুলো আটক করতে পারলেও সড়কে এই বিশৃঙ্খলা থামানো যায়নি।
এদিকে ঢাকার প্রবেশমুখের কাছাকাছি মানিকগঞ্জ-হেমায়েতপুর আঞ্চলিক সড়কের কিটিংচর এলাকায় দুই নম্বরবিহীন যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন কাউসার আহম্মেদ নামের এক তরুণ মোটরসাইকেলচালক। মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার এই মুখোমুখি সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, কাউসার ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং তার সাথে থাকা অপর আরোহী মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। অন্যদিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সোনাশুর এলাকায় দুপুরে ঘটে এক ভয়াবহ ত্রিমুখী সংঘর্ষ। একটি যাত্রীবাহী বাস অন্য একটি বাসকে বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করতে গেলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মাইক্রোবাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় এবং ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে একটি প্রাইভেটকার এসে মাইক্রোবাসটিকে ধাক্কা দেয়। এই ভয়াবহ ত্রিমুখী সংঘর্ষে মাইক্রোবাসের চালক ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং দুমড়ে-মুুচড়ে যাওয়া যানবাহনগুলোর অন্তত ১৫ জন যাত্রী গুরুতর আহত হন। এই দুর্ঘটনার কারণে দক্ষিণবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে প্রায় দেড় ঘণ্টা যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, যার ফলে সৃষ্টি হয় মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট।
ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মহাসড়কে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাগুলো দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাবকে আবারও উলঙ্গ করে দেখিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ ট্রাকে যাত্রী পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও, বাস্তবে মহাসড়কগুলোতে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিবছরই নাড়ির টানে ঘরে ফেরা মানুষের এই আনন্দযাত্রা শেষ পর্যন্ত রক্তে রঞ্জিত এক একটি ট্র্যাজেডিতে পরিণত হচ্ছে, আর দেশের প্রথম পাতার সংবাদে যোগ হচ্ছে একের পর এক মৃত্যুর নির্মম পরিসংখ্যান।