সংবাদ শিরোনাম

চাহিদার মুখে দেশি পশুর রাজত্ব: ছুটির আমেজে জমে উঠেছে রাজধানীর পশুর হাট

 প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

চাহিদার মুখে দেশি পশুর রাজত্ব: ছুটির আমেজে জমে উঠেছে রাজধানীর পশুর হাট

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র বাকি কয়েক দিন। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিরাজ করছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানী ঢাকার পশুর হাটগুলো এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো পশুর ডাক আর ক্রেতা-বিক্রেতাদের দরদামে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ। কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, রাজশাহীর বাঘা, ঝিনাইদহের শৈলকুপা, পাবনা এবং চুয়াডাঙ্গার সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলো থেকে খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা তাদের অতি আদরে লালন-পালন করা গরু, মহিষ ও ছাগল নিয়ে হাজির হয়েছেন রাজধানীর বুকে। গাবতলীর চিরচেনা স্থায়ী হাট থেকে শুরু করে উত্তরার দিয়াবাড়ির বিশাল উন্মুক্ত প্রান্তর—সবখানেই এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

এবারের কোরবানির হাটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং ইতিবাচক দিক হলো দেশি গরুর একচ্ছত্র আধিক্য। বিগত বছরগুলোতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা ভারতীয় কিংবা মিয়ানমারের পশুর যে দাপট দেখা যেত, এবার তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। দেশীয় খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগের নানামুখী উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ এখন গবাদিপশু উৎপাদনে কেবল স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, বরং উদ্বৃত্ত। হাটে দুই-একটা বিদেশি জাতের বড় আকৃতির গরু দেখা গেলেও, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সেগুলোও বছরের পর বছর ধরে এ দেশের মাটিতেই লালন-পালন করেছেন স্থানীয় খামারিরা। ফলে হাটের নিয়ন্ত্রণ এখন পুরোপুরি দেশি খামারিদের হাতে, যা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক বিশাল সুসংবাদ।

গত কয়েক দিন ধরে হাটগুলোতে পশুর জোগান পর্যাপ্ত থাকলেও সেই তুলনায় ক্রেতাসমাগম ছিল কিছুটা কম। অনেক বিক্রেতাই রাজধানী জুড়ে তীব্র গরম আর বৃষ্টিভেজা আবহাওয়ার কারণে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তবে আজ সোমবার সকাল হতেই সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে যেতে শুরু করেছে। সরকারি, আধা-সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট অফিসে ঈদের ছুটি শুরু হতেই মানুষ দলে দলে ছুটছেন হাটের পানে। বিক্রেতারা বলছেন, এত দিন যারা এসেছিলেন তারা মূলত হাটের গতিপ্রকৃতি এবং দামের পারদ পরখ করতে এসেছিলেন। কিন্তু আজ থেকে শুরু হয়েছে প্রকৃত ক্রেতাদের ঢল, যা আগামী ঈদের আগের রাত পর্যন্ত অবিরাম চলবে।

উত্তরা দিয়াবাড়ি হাটে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে ২২টি যমজ কালো ও লাল রঙের দেশি গরু নিয়ে এসেছেন জিয়াউর রহমান। গত শনিবার থেকে হাটে এসে খুঁটি গেড়ে বসলেও রোববার রাত পর্যন্ত তার একটি পশুও বিক্রি হয়নি। তবে আজ সকাল থেকে ক্রেতাদের ভিড় দেখে তার মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। তিনি অত্যন্ত আশাবাদী যে, কর্মব্যস্ত মানুষেরা ছুটি পেয়ে হাটে আসা শুরু করায় আজ রাতের মধ্যেই তার অর্ধেকের বেশি গরু বিক্রি হয়ে যাবে। একই সুর শোনা গেল রাজশাহীর বাঘা থেকে আসা প্রবীণ খামারি আনোয়ার মোল্লার কণ্ঠে। আটটি হৃষ্টপুষ্ট দেশি গরু নিয়ে আসা আনোয়ার মোল্লা পরম বিশ্বাসে জানালেন, প্রতি বছরই তারা ঢাকার হাটে আসেন এবং একটু ধৈর্য ধরলেই ভালো লাভ মেলে। এবারও তিনি সবকটি গরু ভালো দামে বিক্রি করে মুখে চওড়া হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরবেন বলে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছেন।

হাটের ভেতরের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং নিজেদের পশুর জন্য সুবিধাজনক স্থান নিশ্চিত করতে অনেকেই ঈদের বেশ কয়েক দিন আগেই হাটে চলে এসেছেন। ঝিনাইদহের শৈলকুপা থেকে ৩৭টি গরু নিয়ে আসা বড় ব্যবসায়ী বকুল হোসেন জানান, আগেভাগে আসায় হাটের মূল গেটের কাছেই জায়গা পেয়েছেন তিনি। আজ থেকে পুরোদমে বেচাকেনা শুরু হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এবারের বাজার পরিস্থিতি বেশ ভারসাম্যপূর্ণ। গোখাদ্যের দাম কিছুটা বেশি থাকায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে সত্য, তবে তারা ক্রেতাদের নাগালের বাইরে দাম হাঁকাচ্ছেন না। এমন একটি মাঝারি ও যৌক্তিক দামে তারা পশু বিক্রি করতে চান যাতে খামারিদেরও লোকসান না হয়, আবার সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতারাও যেন কোরবানির আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন।

ইতিমধ্যেই হাটে কেনাবেচার খাতা খুলে ফেলেছেন চুয়াডাঙ্গার ফুলবাড়ী থেকে আসা মো. ফারুক হোসেন। তার আনা ১৬টি গরুর মধ্যে দুটি মাঝারি আকারের গরু তিনি আজ সকালেই বিক্রি করেছেন। ফারুক হোসেন জানান, হাটে থাকার দৈনিক খরচ এবং যাতায়াত ভাড়া তুলতে গিয়ে তিনি খুব বেশি লাভ করেননি, মাত্র ১৫ হাজার টাকা লাভে গরু দুটি ছেড়ে দিয়েছেন। তবে তার মূল লক্ষ্য বাকি ১৪টি বড় গরু, যেগুলোর জন্য মূল ক্রেতাদের ঢল আজ দুপুরের পর থেকেই নামতে শুরু করেছে। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থেকে ২১টি গরু নিয়ে আসা জাহিদুল ইসলামও হাটের এই উপচে পড়া ভিড় দেখে দারুণ উল্লসিত। তার মতে, আজ সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই কেনাবেচার জোয়ার আগামী ৪৮ ঘণ্টায় এক অভূতপূর্ব রূপ নেবে। সব মিলিয়ে, রাজধানীর পশুর হাটগুলো এখন দেশি পশুর গৌরবে এবং ক্রেতা-বিক্রেতার মেলবন্ধনে এক উৎসবের জনপদে পরিণত হয়েছে।