সরকারি হাসপাতালের খাবার মুখে দিয়েই ফেলে দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী: খুলনা জেনারেল হাসপাতালে তুলকালাম
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা
খুলনার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তখন সকাল সাড়ে ১০টা। হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার পেছনে কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড়। বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলার পর মন্ত্রী হঠাৎ পা বাড়ালেন হাসপাতালের রান্নাঘরের দিকে। সেখানে বড় বড় ডেকচিতে রোগীদের জন্য দুপুরের খাবার তৈরি হচ্ছিল। মন্ত্রী একটি পাত্রে থাকা কুমড়ার তরকারি চামচে করে মুখে তুললেন। কিন্তু মুখে দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার মুখের অবয়ব বদলে গেল। অত্যন্ত নিম্নমানের ও বিস্বাদ সেই খাবারটি তিনি গিলে ফেলতে পারলেন না, সঙ্গে সঙ্গেই মুখ থেকে ফেলে দিলেন।
সেখানেই শেষ নয়, চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে উপস্থিত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে উদ্দেশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কড়া ভাষায় প্রশ্ন করেন, এই ধরনের তরকারি যদি আপনাদের বাসায় রান্না হতো, আপনারা কি নিজেরা খেতেন? মন্ত্রীর এমন আকস্মিক ও সরাসরি প্রশ্নে রান্নাঘরে উপস্থিত চিকিৎসক এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্টকে ডেকে রোগীদের জন্য মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশ দেন। রান্নাঘর পরিদর্শনের পাশাপাশি মন্ত্রী হাসপাতালের বহির্বিভাগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শৌচাগারগুলোর বেহাল দশা সরেজমিনে ঘুরে দেখেন এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।
খাবার নিয়ে এই তুলকালাম কাণ্ডের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন ওয়ার্ডে সাধারণ রোগীদের খোঁজখবর নিতে যান, তখন বেরিয়ে আসে আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। কয়েকজন ভুক্তভোগী রোগী মন্ত্রীর কাছে সরাসরি অভিযোগ করেন যে, হাসপাতালে বিনামূল্যে পাওয়ার কথা থাকলেও র্যাবিস বা জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন পেতে তাদের চরম হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অনেককে বাধ্য হয়ে ২৫০ টাকা দিয়ে বাইরে থেকে এই ভ্যাকসিন কিনতে হয়েছে।
বিনামূল্যের সরকারি ওষুধ রোগীরা টাকা দিয়ে কিনছেন শুনে মন্ত্রীর ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। তিনি ঘটনাস্থলেই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক গাজী রফিকুল ইসলামের কাছে এই অব্যবস্থাপনার কারণ জানতে চান। জবাবে তত্ত্বাবধায়ক দাবি করেন, পূর্বে সরকারিভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় সাময়িকভাবে এই সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তবে মন্ত্রীর তীক্ষ্ণ নজরদারি থেকে পার পাওয়া যায়নি। তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হতে ওয়ার্ডে দাঁড়িয়েই তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় দপ্তরে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে মন্ত্রী জানতে পারেন, খুলনা হাসপাতাল থেকে ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য কোনো চাহিদাপত্রই (রিকুইজিশন) পাঠানো হয়নি। কর্তৃপক্ষের এমন চরম গাফিলতি ও মিথ্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করে নিয়ে বলেন, হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে কিছু অনিয়ম হয়তো থেকে যায়। তবে সব অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না, কিছু অনিয়ম হয়তো ক্ষমাযোগ্য কিন্তু জনগণের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মতো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। জনগণের স্বার্থে যতটুকু কঠোর অ্যাকশন নেওয়া প্রয়োজন, মন্ত্রণালয় ততটুকুই নেবে। অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন নিয়ে যে জালিয়াতি ও গাফিলতি দেখা গেছে, তা কোনোভাবেই হওয়ার কথা ছিল না। এই পুরো বিষয়টি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন তিনি। তবে এতসব নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও মন্ত্রী উল্লেখ করেন, ওয়ার্ড পরিদর্শনের সময় অনেক সাধারণ রোগী চিকিৎসকদের নিয়মিত সেবা ও আচরণ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই আকস্মিক ও ঝটিকা পরিদর্শনের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত এবং খুলনার সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। মন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থানের পর হাসপাতাল জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ আশা করছেন, এবার হয়তো হাসপাতালের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও খাবারের মানের উন্নয়ন ঘটবে।