সম্পর্কের নতুন দিগন্তে ঢাকা-রাবাত: মরক্কোর সাথে অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিতে চায় বাংলাদেশ
ঢাকা,প্রতিনিধি:
আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা আরও গভীর করার লক্ষ্যে মরক্কোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক অংশীদারত্বকে সহযোগিতা, অভিন্ন সমৃদ্ধি ও কৌশলগত সম্ভাবনার এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশের এই নতুন কূটনৈতিক অভিযাত্রার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন সফররত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। মরক্কোর রাজধানী রাবাতে দেশটির শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের এই প্রত্যয় ও সম্ভাবনার চিত্র ফুটে উঠেছে। বুধবার (২০ মে) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই ঐতিহাসিক সফরের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক বিস্তারিতভাবে জানানো হয়।
কূটনৈতিক এই তৎপরতার অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার (১৯ মে) রাবাতে মরক্কোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আফ্রিকান সহযোগিতা ও প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রী নাসের বুরিতার সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সফর ও পারস্পরিক যোগাযোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক মরক্কো সফরের কথা স্মরণ করেন। সেই সফরের সুদূরপ্রসারী প্রভাব হিসেবে রাবাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ শহীদ জিয়ার নামে করায় মরক্কো সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। কৃতজ্ঞতার এই বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে প্রতিমন্ত্রী সুবিধাজনক সময়ে মরক্কোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে চলমান দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে ঢাকায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরবর্তী ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’ (এফওসি) আয়োজনের ব্যাপারে দুই নেতাই একমত হয়েছেন।
দুই দেশের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বস্ত্রশিল্প, ওষুধশিল্প, সিরামিক, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, কৃষি, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, জাহাজ নির্মাণ এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধিসহ বহুমুখী খাতে সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতেও একে অপরকে সহযোগিতা করার বিষয়ে দুই দেশ একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে বাস্তব রূপ দিতে ওই দিন বিকেলেই মরক্কোর শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী রিয়াদ মেজ্জুরের সঙ্গে আরেকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন শামা ওবায়েদ। সেখানে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান ও উন্নত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের চিত্র তুলে ধরেন এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বিনিময়ের প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশের এই প্রস্তাবকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে মরক্কোর শিল্পমন্ত্রী চলতি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল পাঠানোর তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেন।
উক্ত বৈঠকে বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়টিও বিশেষভাবে প্রাধান্য পায়। মরক্কোর সঙ্গে কৃষিখাতে বিদ্যমান চমৎকার অংশীদারত্বের প্রশংসা করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ফসফরাস ও ফসফেট আমদানির ক্ষেত্রে আরও নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ার বিষয়টি মাথায় রেখে মরক্কোর বাজারে বাংলাদেশের উন্নতমানের পাট ও পাটজাত পণ্যের প্রসারে যৌথভাবে কাজ করার জন্য ঢাকার পূর্ণ প্রস্তুতির কথা জানান তিনি। আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের শিল্প খাতকে এগিয়ে নিতে উদ্ভাবন, শিল্প প্রশিক্ষণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে গভীরতর সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়েও দুই মন্ত্রী বিস্তারিত আলোচনা করেন।
একই দিনে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে মরক্কোর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী ইউনেস সেক্কুরির সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। বৈঠকে শামা ওবায়েদ বাংলাদেশের নতুন সরকারের জনকল্যাণমুখী সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ—যেমন ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার্স কার্ড’ কর্মসূচি এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখার অন্যতম হাতিয়ার ‘খাল পুনঃখনন প্রকল্প’ সহ বিভিন্ন দূরদর্শী উন্নয়ন কার্যক্রমের সাফল্য মরক্কোর মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। দুই দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিপুল সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে জ্ঞান বিনিময়, কারিগরি সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।
মরক্কোর মাটিতে বাংলাদেশের এই বহুমাত্রিক ও ফলপ্রসূ কূটনৈতিক বৈঠকগুলোতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন মরক্কোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাদিয়া ফায়জুন্নেসা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (আফ্রিকা) আবদুর রউফ মণ্ডল।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফরে মরক্কোতে অবস্থান করছেন। দ্বিপাক্ষিক এই সিরিজ বৈঠক সম্পন্ন করার পর, তিনি ২০ মে ২০২৬ তারিখে রাবাতে অনুষ্ঠিতব্য বৈশ্বিক শান্তিরক্ষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ ‘ফ্রাঙ্কোফোন পরিবেশে শান্তিরক্ষা বিষয়ক দ্বিতীয় মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে’ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিমন্ত্রীর এই মরক্কো সফর আফ্রিকার বিশাল বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশদ্বারকে যেমন উন্মুক্ত করবে, তেমনই দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।