সংবাদ শিরোনাম

ঈদের আনন্দযাত্রায় ভরসা সৈয়দপুরের কারিগররা: ২৩% জনবল নিয়েই দিনরাত চলছে ১২৭ কোচ সাজানোর মহাযজ্ঞ

 প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ০৭:৪৮ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

ঈদের আনন্দযাত্রায় ভরসা সৈয়দপুরের কারিগররা: ২৩% জনবল নিয়েই দিনরাত চলছে ১২৭ কোচ সাজানোর মহাযজ্ঞ

সংবাদদাতা, সৈয়দপুর, নীলফামারী। 

​আসন্ন ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি করতে প্রতি বছরই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে বাড়ি ফেরেন। আর এই ঘরমুখো মানুষের ঈদ যাত্রা বরাবরই এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। সড়কপথের যানজট আর ভোগান্তি এড়াতে সিংহভাগ মানুষের প্রথম পছন্দ থাকে দেশের ঐতিহ্যবাহী গণপরিবহন রেলওয়ে। তবে ঈদ যাত্রায় প্রতিবারই দেখা দেয় তীব্র যাত্রীচাপ এবং টিকিটের আকাশচুম্বী চাহিদা। এই বিপুল পরিমাণ যাত্রীচাপ সামাল দিতে এবং ঈদ যাত্রাকে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন করতে প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যাকস্টেজ হিরো বা নেপথ্যের কারিগরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানার শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা। নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় এখন চলছে এক অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ। জরাজীর্ণ, অকেজো ও পুরাতন রেলকোচগুলোকে মেরামত করে সম্পূর্ণ নতুন ও চকচকে রূপ দিতে দিনরাত এক করে কাজ করছেন এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

​বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত করার জন্য এবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মোট ১২৭টি রেলকোচ সচল করার। এই বিপুল সংখ্যক কোচ দেশের বিভিন্ন রুটের আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর সঙ্গে অতিরিক্ত বগি হিসেবে সংযুক্ত করা হবে, যার ফলে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান প্রধান রুটগুলোতে রেলের যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। রেলওয়ে কারখানা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কারখানার ২৮টি শপ বা উপ-বিভাগে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সেখানকার শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা তাদের নিয়মিত কর্মঘণ্টার সীমানা পেরিয়ে অতিরিক্ত সময় বা ওভারটাইম কাজ করে চলেছেন। মে দিবস বা অন্যান্য ছুটির আমেজকে দূরে ঠেলে তাদের একমাত্র লক্ষ্য—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবকটি কোচকে ট্রাফিক বিভাগের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া। আনন্দের কথা হলো, নিরলস এই পরিশ্রমের ফল ইতিবাচক হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৯৯টি কোচ সম্পূর্ণ মেরামত ও রঙ শেষে ট্রাফিক বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তেই লাইনে নামার জন্য প্রস্তুত। অবশিষ্ট কোচগুলোর কাজও এখন শেষ পর্যায়ে এবং আগামী কয়েক কর্মদিবসের মধ্যেই সেগুলো রেলের বহরে চূড়ান্তভাবে যুক্ত হওয়ার জন্য হস্তান্তর করা হবে বলে কর্তৃপক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

​তবে এই ঝকঝকে সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক চরম বাস্তবতার গল্প। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাটি বর্তমানে তীব্র জনবলসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে, কারখানাটিতে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ২ হাজার ৮৫৯টি, যার বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৬৬৪ জন শ্রমিক-কর্মচারী। গাণিতিক হিসাবে, মাত্র ২৩ শতাংশ জনবল নিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই রেল কারখানার উৎপাদন ও মেরামত কার্যক্রম জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ, একেকজন শ্রমিককে স্বাভাবিকের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। কিন্তু এই চরম সীমাবদ্ধতাও তাদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। দেশের মানুষের ঈদ যাত্রার আবেগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই জরাজীর্ণ ও তীব্র জনবলসংকটের মধ্যেও পুরাতন কোচগুলোর চাকার ট্রলি মেরামত, বগির ধাতব কাঠামো পরিবর্তন, ভেতরের আসনবিন্যাস আধুনিকীকরণ, উন্নত বৈদ্যুতিক সংযোগ নিশ্চিতকরণ এবং দৃষ্টিনন্দন রঙ ও সাজসজ্জার কাজ নিখুঁতভাবে করা হচ্ছে। এই মহৎ কর্মযজ্ঞে কারখানার বগি শপ, হেভি রিপেয়ারিং শপ, ক্যারেজ কনস্ট্রাকশন শপ এবং পেইন্ট শপসহ আরো ২৪টি শপ একে অপরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

​কারখানার শিডিউল শপের ইনচার্জ প্রকৌশলী রুহুল আমীন এই কর্মযজ্ঞের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন যে, ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা স্বস্তিদায়ক করাই এখন তাদের মূল ব্রত। যাত্রীচাপ মোকাবিলায় বাড়তি কোচ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কারখানার প্রতিটি শপে স্বাভাবিক কাজের বাইরে গিয়ে এই বিশেষ কাজগুলো করা হচ্ছে, যাতে প্রতিটি বগি শতভাগ নিরাপদ ও ব্যবহার উপযোগী হিসেবে গড়ে ওঠে। বিভিন্ন শপে হাতুড়ি আর ওয়েল্ডিংয়ের শব্দের মাঝে কর্মরত কয়েকজন প্রবীণ শ্রমিক আবেগের সাথে জানান, প্রয়োজনীয় মালামাল ও তীব্র জনবলসংকট তাদের কাজের গতিকে মাঝে মাঝে ব্যাহত করে ঠিকই, কিন্তু যখন তারা ভাবেন যে তাদের হাতের ছোঁয়ায় ঠিক হওয়া গাড়িতে চড়ে হাজারো মানুষ নিরাপদে মায়ের কোলে, পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন, তখন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। ঈদ যাত্রীসেবাকে তারা পেশাগত দায়িত্বের চেয়ে বড় করে দেখছেন।

​একই সুর শোনা গেল ক্যারেজ শপের ইনচার্জ প্রকৌশলী মমিনুল ইসলামের কণ্ঠেও। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনবলসংকট থাকা সত্ত্বেও ঈদের যাত্রীসেবা এই মুহূর্তে তাদের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যাত্রীরা যেন কোনো ধরনের ভোগান্তি ও নির্বিঘ্নে স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উদ্‌যাপন করতে পারেন, সেজন্য প্রতিটি আন্তঃনগর ট্রেনে সর্বোচ্চ সংখ্যক অতিরিক্ত কোচ সংযোজনের এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

​এই বিশাল কর্মযজ্ঞের তদারকি ও সার্বিক বিষয় নিশ্চিত করে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, ঈদ যাত্রায় দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে গতিশীল করতে এবং বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো জনবহুল রুটে যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে এই ১২৭টি কোচ রেলের বহরে ম্যাজিকের মতো কাজ করবে। ইতিমধ্যে সিংহভাগ অর্থাৎ ৯৯টি কোচ ট্রাফিক বিভাগে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে এবং বাকি কোচগুলোও আগামী কয়েকদিনের মধ্যে লাইনে চলে আসবে। আধুনিক রেলওয়ের সেবার মান বজায় রেখে তীব্র সংকটের মধ্যেও শ্রমিকদের এই ত্যাগ ও নিষ্ঠা দেশের রেল খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়িয়ে দেবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সব মিলিয়ে, সৈয়দপুর কারখানার এই কর্মব্যস্ততা এবারের ঈদে লাখো মানুষের বাড়ি ফেরার পথকে আরও কিছুটা মসৃণ, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলবে, এটাই এখন দেশবাসীর প্রত্যাশা।