সংবাদ শিরোনাম

ব্যাংক খাতে মহাসংকট: ২০ ব্যাংকে ঘাটতি পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা, খেলাপি ঋণ ৩০% ছাড়িয়ে রেকর্ড

 প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৮:২৯ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

ব্যাংক খাতে মহাসংকট: ২০ ব্যাংকে ঘাটতি পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা, খেলাপি ঋণ ৩০% ছাড়িয়ে রেকর্ড

বাণিজ্য ডেস্ক:

​দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি আর লাগামহীন লুটপাটের চূড়ান্ত পরিণতি এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। একের পর এক ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মূলধন ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় পুরো আর্থিক খাত এক নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত, বেসরকারি ও ইসলামী ধারা মিলিয়ে দেশের অন্তত ২০টি ব্যাংক বড় ধরনের মূলধন সংকটে পড়েছে। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি কেবল কোনো সাধারণ গাণিতিক হিসাব নয়, বরং এটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার চরম ভঙ্গুরতা ও ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাওয়ার এক নির্মম দলিল। অথচ এর মাত্র তিন মাস আগে, অর্থাৎ একই বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ২৩টি এবং সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে কাগজে-কলমে এই ঘাটতি কিছুটা কমলেও অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা একে কোনোভাবেই প্রকৃত উন্নতি বলতে নারাজ। তাদের মতে, এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতিগত ছাড় ও ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধার মাধ্যমে তৈরি করা একটি কৃত্রিম স্বস্তি মাত্র, যা দিয়ে ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত ক্ষত ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।

​মূলত একটি ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যায়, তখনই তাকে মূলধন ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নিয়ম বা ব্যাসেল-৩ মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ করা আইনি বাধ্যবাধকতা। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা কতটা তলানিতে ঠেকেছে, তা স্পষ্ট হয় বা ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও সিআরএআর সূচকের দিকে তাকালে। গত ডিসেম্বর শেষে এই প্রধান সূচকটি ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী এই হার ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক। এই ভয়াবহ সংকটের মূল উৎস হিসেবে কাজ করছে লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ। তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা দেশের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বিপুল পরিমাণের এই খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হচ্ছে, যা সরাসরি ব্যাংকের মূলধনকে গ্রাস করে ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, আগ্রাসী ব্যাংকিং, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং প্রভাবশালী খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই ব্যাংক খাতে আজ এই মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে।

​খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূলধনের এই বিশাল ঘাটতি কেবল নির্দিষ্ট কোনো খাতের ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন থেকে শুরু করে বেসরকারি ও শরীয়াহ ভিত্তিক সব ব্যাংকেই ছড়িয়ে পড়েছে। গত ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক, যার একক ঘাটতির পরিমাণই ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে, যেখানে সাতটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। এই ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও সর্বোচ্চ, যার পরিমাণ ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এরপরই রয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক যার ঘাটতি ৩০  হাজার ৫৩ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২ কোটি টাকা। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর এই আকস্মিক পতন পুরো আর্থিক খাতের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।

​রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ধারার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সাতটি বাণিজ্যিক ব্যাংকেও বড় ধরনের মূলধন সংকট দেখা দিয়েছে, যাদের সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ ৩৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, যার ঘাটতি ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে এবি ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা এবং সিটিজেনস ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর বাইরে দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থায়নের জন্য গঠিত বিশেষায়িত খাতের দুটি সরকারি ব্যাংকও বড় অঙ্কের মূলধন সংকটে ভুগছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ कृषि ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এই চিত্র প্রমাণ করে যে, দেশের ব্যাংকিং খাতের কোনো অংশই এখন আর নিরাপদ বা ঝুঁকিমুক্ত নয়।

​তিন মাসের ব্যবধানে সামগ্রিক মূলধন ঘাটতি ৪ হাজার কোটি টাকার মতো কমার পেছনে মূল জাদুকরী ভূমিকা রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন নীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, বছরের শেষ প্রান্তে এসে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশকে জোরপূর্বক বা বিশেষ সুবিধায় নিয়মিত দেখানো হয়েছে। এর ফলে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমায় এসব ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণের আইনি বাধ্যবাধকতা ও প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। যেহেতু ব্যাংকের মূলধন থেকেই এই প্রভিশন রাখতে হয়, তাই প্রভিশনের চাপ কমায় মূলধন ঘাটতিও সাময়িকভাবে কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ নীতিমালার মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে কাগজের পাতায় পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি দেখানো গেলেও ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্যের বা তারল্যের কোনো বাস্তব পরিবর্তন হয় না। বরং এটি প্রকৃত সংকটকে আড়াল করে সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করে তোলে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর দেউলিয়া আইন প্রয়োগসহ কার্যকর আইনি পদক্ষেপ ছাড়া এই গভীর ও কাঠামোগত সংকট থেকে উত্তরণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

​এদিকে এই ক্রমাগত ও দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সংকটের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা ও মন্দাভাব নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকাররা। তারা বলছেন, পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় ব্যাংকগুলোর নতুন করে বড় কোনো প্রকল্পে বা ব্যবসায়ে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও নতুন শিল্পায়নের ওপর। ব্যাংকের ঋণ প্রবাহ কমে গেলে উৎপাদন খাত ব্যাহত হবে, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দেবে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট রেটিং বা ঋণমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্রমাগত মূলধন ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক লেনদেন, এলসি বা ঋণপত্র খোলা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলো এখন বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থা হারাচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি বিদেশি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তি বা গ্যারান্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন নতুন শর্ত ও নানামুখী চাপ তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের বিপদের সংকেত।