সব চেষ্টাই ব্যর্থ, চিরতরে নিভে গেল ‘ইন্টার্নশিপ’খ্যাত তরুণ প্রতিভা কারিনা কায়সারের জীবনপ্রদীপ
অনলাইন ডেস্ক:
অভিনয় আর চিত্রনাট্যের জাদুতে দর্শকদের মুগ্ধ করা জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও চিত্রনাট্যকার কারিনা কায়সার আর নেই। লিভারের মারাত্মক জটিলতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে ভারতের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অকালপ্রয়াত এই তরুণ প্রতিভার মরদেহ আজ রোববার বিকেলে দেশে এসে পৌঁছেছে। বিমানবন্দর থেকে তার লাশ গ্রহণ করেন তার বাবা, দেশের ফুটবলের কিংবদন্তি ও সাবেক তারকা ফুটবলার কায়সার হামিদ। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মরদেহবাহী গাড়িটি তাদের বনানীর বাসভবনের উদ্দেশে রওনা হলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রিয়জন ও শুভানুধ্যায়ীদের অশ্রুসজল চোখে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, কারিনার এই অকাল মৃত্যুর পেছনে রয়েছে এক আকস্মিক ও জটিল চিকিৎসাগত বিপর্যয়। প্রাথমিকভাবে তিনি সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত পরবর্তীতে সেই সাধারণ জ্বর থেকে তার পুরো শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ বা ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি তিনি হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। ডাবল হেপাটাইটিসের এই ভয়াবহ সংক্রমণে তার লিভার দ্রুত কার্যকারিতা হারাতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত লিভার ফেইলিউর দেখা দেয়। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে দ্রুত ভর্তি করে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে ও পরিবারের আপ্রাণ চেষ্টায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জরুরি ভিত্তিতে ভারতের চেন্নাইয়ে স্থানান্তর করা হয়। চেন্নাইয়ের হাসপাতালে চিকিৎসকেরা প্রথমে তার ফুসফুসের জটিলতার চিকিৎসা শুরু করেছিলেন এবং একই সাথে লিভার প্রতিস্থাপনের (ট্রান্সপ্ল্যান্ট) সব ধরনের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ও কোটি ভক্তের প্রার্থনা ব্যর্থ করে দিয়ে শনিবার জীবনের ওপারে পাড়ি জমান এই সম্ভাবনাময় তরুণী।
কারিনা কায়সারের এই আকস্মিক চলে যাওয়া দেশের বিনোদন ও ওটিটি (OTT) ইন্ডাস্ট্রির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। অভিনয়ের পাশাপাশি একজন প্রতিভাবান চিত্রনাট্যকার হিসেবে অত্যন্ত অল্প সময়ে তিনি নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির তুমুল জনপ্রিয় অরিজিনাল সিরিজ ‘ইন্টার্নশিপ’ এবং সমাদৃত কাজ ‘৩৬-২৪-৩৬’ এর পেছনে তার সৃজনশীল অবদান দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। আধুনিক মনন ও বাস্তবসম্মত নির্মাণশৈলীর কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনুপ্রেরণার নাম। তার এই অকাল প্রয়াণে বিনোদন অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের স্তব্ধতা। সহকর্মী, নির্মাতা ও ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার স্মৃতি চারণ করে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছেন।
এদিকে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ বাদ মাগরিব রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের কেন্দ্রীয় মসজিদে কারিনা কায়সারের প্রথম জানাজা সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর বাদ এশা বনানী দরবার শরিফে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে রাত ১০টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, যেখানে তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, ভক্ত ও সাধারণ মানুষ তাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাবেন। শহীদ মিনারের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সোমবার বাদ ফজর মুন্সিগঞ্জের আবদুল্লাহপুরে তার মায়ের দান করা মসজিদের জায়গার পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে এই গুণী শিল্পীকে। তার এই চলে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের অকাল সমাপ্তি।