আইনজীবীর পোশাকে আদালতে মমতা: মুখ্যমন্ত্রীর সওয়াল নিয়ে বিসিআই-এর কড়া পদক্ষেপ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ১৫ মে, ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির চেনা আঙিনা ছেড়ে এবার আদালতের এজলাসে কালো গাউন ও ব্যান্ড পরে হাজির হয়ে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ কয়েক দশক পর আইনজীবীর পোশাকে তাঁর এই ‘ভিন্ন রূপ’ নজর কাড়লেও, বিষয়টি নিয়ে আইনি বৈধতার প্রশ্ন তুলেছে খোদ ভারতের সর্বোচ্চ আইনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা— বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (বিসিআই)।
একজন সিটিং মুখ্যমন্ত্রী কি এভাবে আদালতে সওয়াল করতে পারেন? তাঁর প্র্যাকটিস সার্টিফিকেট কি এখনো বৈধ? এমন একাধিক প্রশ্ন তুলে পশ্চিমবঙ্গ বার কাউন্সিলের কাছে জরুরি রিপোর্ট তলব করেছে বিসিআই।
আদালতে যা ঘটেছিল
বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিতর্কিত ‘বুলডোজার অভিযান’ সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানি ছিল। শুনানির এক পর্যায়ে হঠাৎ দেখা যায়, সাধারণ রাজনৈতিক নেত্রীর পোশাকের বদলে আইনজীবীর কালো পোশাকে এজলাসে প্রবেশ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের সরকারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি দীর্ঘক্ষণ সওয়াল করেন।
মুখ্যমন্ত্রীর এই আকস্মিক পদক্ষেপে বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ে আদালত কক্ষের আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে। এর আগে অনেকবার আদালত চত্বরে তাঁকে দেখা গেলেও, সরাসরি আইনজীবীর ভূমিকায় সওয়াল করার নজির তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিরল।
বিসিআই-এর চিঠিতে আইনি প্যাঁচ
মুখ্যমন্ত্রীর এই ভূমিকার পরপরই নড়েচড়ে বসেছে দিল্লির বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া। পশ্চিমবঙ্গ বার কাউন্সিলের সচিবকে পাঠানো এক কড়া চিঠিতে বিসিআই পাঁচটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্য চেয়েছে:
নিবন্ধন: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদৌ আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত কি না এবং তাঁর এনরোলমেন্ট নম্বর ও তারিখ কত?
প্র্যাকটিস স্থগিত: মুখ্যমন্ত্রী বা অন্য কোনো লাভজনক সাংবিধানিক পদে থাকাকালীন তিনি নিয়ম অনুযায়ী তাঁর ওকালতি করার লাইসেন্স স্থগিত (Suspend) করেছিলেন কি না?
অনুমতি: পুনরায় আইন পেশায় ফিরতে গেলে যে প্রশাসনিক আবেদন করতে হয়, তা তিনি করেছিলেন কি না?
সার্টিফিকেট: তাঁর বর্তমান ‘সার্টিফিকেট অব প্র্যাকটিস’ বৈধ কি না?
বিসিআই স্পষ্ট জানিয়েছে, তদন্ত চলাকালীন কোনো নথি যেন পরিবর্তন বা সংশোধন করা না হয়। আগামী ১৬ মের মধ্যে যাবতীয় নথির সত্যায়িত কপি দিল্লিতে পাঠাতে হবে।
কেন এই বিতর্ক?
ভারতের ‘অ্যাডভোকেটস অ্যাক্ট, ১৯৬১’ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি পূর্ণকালীন বেতনভুক্ত কোনো পদে (যেমন মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রী) থাকেন, তবে তিনি সক্রিয়ভাবে ওকালতি করতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে তাঁকে বার কাউন্সিলে তাঁর লাইসেন্স জমা দিতে হয়। দায়িত্ব ছাড়ার পর আবার আবেদনের মাধ্যমে সেই লাইসেন্স সচল করতে হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত এক দশকের বেশি সময় ধরে মুখ্যমন্ত্রীর পদে রয়েছেন, তাই তাঁর প্র্যাকটিস করার অধিকার নিয়ে এই প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক ও আইনি মহলে প্রতিক্রিয়া
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলের একাংশের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আইন পাস করেছেন এবং তাঁর নিবন্ধিত সদস্যপদ রয়েছে, ফলে আইনের সওয়াল করতে তাঁর কোনো বাধা নেই।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবির এবং আইন বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, মুখ্যমন্ত্রীর মতো একটি সাংবিধানিক পদে থেকে আদালতে প্র্যাকটিস করা পেশাগত আচরণবিধির (Professional Conduct) পরিপন্থী।
পশ্চিমবঙ্গ বার কাউন্সিল এখনো বিসিআই-এর চিঠির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে ১৬ মে-র সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় এই বিতর্ক এখন তুঙ্গে। আগামী কয়েক দিনে রাজ্য রাজনীতি এবং বিচার বিভাগীয় অঙ্গনে মমতার এই ‘আইনজীবী সত্তা’ কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সারা ভারত।