সংবাদ শিরোনাম

শাপলা চত্বর গণহত্যা: ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তার দেখানো হলো দীপু মনি, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে

 প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ১০:০৮ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

শাপলা চত্বর গণহত্যা: ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তার দেখানো হলো দীপু মনি, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও গণহত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং সাংবাদিক দম্পতি মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক আদেশ প্রদান করেন। আদেশের পরপরই কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আসামিদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে সকালে এই তিন আসামিকে ট্রাইব্যুনালের বিশেষ এজলাসে হাজির করা হলে আদালত প্রাঙ্গণে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের উপস্থিতিতে আদালত কক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।

​শুনানি চলাকালে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০১৩ সালের ওই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সময় ডা. দীপু মনি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, শাপলা চত্বরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পর তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। তিনি তখন বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাকে অবহিত করেছিলেন যে, ওই দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো গণহত্যা চালায়নি, বরং কেবল কিছু বিশৃঙ্খলাকারীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম আদালতে যুক্তি দেন যে, দীপু মনি তার পদের অপব্যবহার করে এই ভয়াবহ অপরাধকে আড়াল করার অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন, যা সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধের সহায়ক হিসেবে গণ্য হয়।

​অন্যদিকে, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তর টিভির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু এবং প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপার বিরুদ্ধে উস্কানি ছড়ানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমাবেশের দিন সকাল থেকেই একাত্তর টেলিভিশনের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের কর্মকাণ্ডকে চরম উস্কানিমূলক হিসেবে প্রচার করা হয়। এমনকি অভিযানের সময় এবং পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমের শক্তি ব্যবহার করে তারা হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে প্রসিকিউশন দাবি করে। আসামিদের উপস্থিতিতেই প্রসিকিউটর আদালতকে জানান, গণমাধ্যমের নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

​মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে এবং ট্রাইব্যুনাল আগামী ৭ জুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেছেন। উল্লেখ্য, গত ৭ মে তদন্ত সংস্থার বিশেষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার আদেশ দিয়েছিলেন। এই মামলায় ডা. দীপু মনিসহ এখন পর্যন্ত মোট ছয়জন হেভিওয়েট আসামিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার কবির এবং সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল।

​শাপলা চত্বরের এই ঘটনার দীর্ঘ ১১ বছর পর বিচারের এই নতুন মোড়কে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারী হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক তার আবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, ওই দিন গভীর রাতে আলো নিভিয়ে পরিকল্পিতভাবে ঘুমন্ত মানুষের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। মাওলানা মামুনুল হক ও জুনায়েদ আল হাবিবের পক্ষে দায়ের করা এই অভিযোগে মোট ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগ জানিয়েছে, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনে আরও অনেক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হতে পারে। আদালতের এই আদেশের পর নিহতের স্বজনদের মধ্যে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা নতুন করে জেগে উঠেছে।