সংবাদ শিরোনাম

লৌহকপাটের সেই দিনগুলো: এ্যানির স্মৃতিতে কারাজীবনের অজানা আখ্যান

 প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ১০:১৯ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

লৌহকপাটের সেই দিনগুলো: এ্যানির স্মৃতিতে কারাজীবনের অজানা আখ্যান

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​কারাগারের চার দেয়াল আর লোহার শিকল যেখানে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, সেখানেই গড়ে উঠেছিল এক অদ্ভুত ভ্রাতৃত্ব আর সহমর্মিতার গল্প। বুধবার (১৩ মে) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের আব আব্দুস সালাম হলে জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারের পাঁচটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে সেই রুদ্ধদ্বার জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করলেন বর্তমান সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। রাজনৈতিক বৈরিতা ছাপিয়ে কারাগারে কীভাবে গড়ে উঠেছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর মানবিক সম্পর্ক, তারই এক জীবন্ত দলিল ফুটে ওঠে তার বক্তব্যে।

​'আল্লাহর হুকুমেই স্বৈরাচারের পতন'

​৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে ‘স্রেফ আল্লাহর হুকুম’ হিসেবে অভিহিত করে এ্যানি বলেন, “১ আগস্টও আমরা জেলখানায় বসে আন্দালিব রহমান পার্থসহ ছয় মাসের বাজার করেছিলাম। পিসির (প্রিজনারস ক্যান্টিন) টাকা দিয়ে ইলেকট্রিক চুলা পর্যন্ত কিনেছিলাম। কল্পনাও করিনি যে এত দ্রুত এই ‘ফ্রাঙ্কেস্টাইন’ শাসনের অবসান হবে। ৫ তারিখ যখন রেডিওতে হাসিনার পলায়নের খবর শুনলাম, জেলখানায় আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম।”

​তিনি আরও যোগ করেন, “৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুরে একদিনেই ১৩ জন মারা যাওয়ার খবর পেয়ে আমি মুষড়ে পড়েছিলাম। সেই রক্তের সাগর পেরিয়ে ৫ তারিখের ভোরবেলায় যখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল, তখন সংশয় জেগেছিল মানুষ রাস্তায় নামতে পারবে কি না। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে যখন রোদের দেখা পেলাম, তখনই বুঝেছিলাম—আজ না হোক কাল, এই দুঃশাসনের বিদায় সুনিশ্চিত।”

​কারাগারের দস্তরখান: সাঈদী থেকে নিজামী

​এ্যানি তার বক্তব্যে তুলে ধরেন ওয়ান ইলেভেন ও পরবর্তী সময়ে কারাবন্দি শীর্ষ নেতাদের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একবার কাশিমপুর কারাগারে ২৬ সেলে থাকাকালীন আব্দুস সালাম ও পিন্টু সাহেবরা আমাকে বড় এক ভোজের দায়িত্ব দিলেন। আমি ১০টি তাজা মুরগি আনিয়েছিলাম। নরসিংদীর বাবুর্চি শাহজাহানকে দিয়ে রান্নার এলাহি আয়োজন হলো। সেই দস্তরখানে সেদিন আমার সাথে শামিল ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, কর্নেল ওলি আহমদ, মির্জা আব্বাস, আল্লামা সাঈদী, মতিউর রহমান নিজামী এবং মুজাহিদ সাহেবদের মতো শীর্ষ নেতারা। মজার ব্যাপার হলো, ওই আয়োজনের ঠিক পরের দিনই আমাদের সবাইকে আলাদা আলাদা জেলে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল।”

​কাঁঠাল-আমের বিনিময় ও অদ্ভুত এক 'মাছ খাওয়া' প্রতিযোগিতা

​কারাগারের কঠোর শৃঙ্খলার মাঝেও চলত হৃদ্যতাপূর্ণ বিনিময়। এ্যানি জানান, জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর সাথে তার কাঁঠাল ও আম বিনিময়ের গল্প। “গাজীপুর কারাগারে মীর কাসেম সাহেব আমাকে বলতেন—তোমার সুরমা সেলে তো অনেক কাঁঠাল, আমাকে পাঠাও না কেন? আমি তাকে কাঁঠাল পাঠাতাম, আর তিনি আমার জন্য আম পাঠাতেন।”

​আবার আব্দুল কাদের মোল্লাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী মানুষ। সুরমা সেলে থাকাকালীন তিনি প্রায়ই আমার সাথে ‘কৈ মাছ খাওয়ার প্রতিযোগিতা’ করতেন। তিনি মাছের মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত এমনভাবে খেতেন যে থালায় একটা কাঁটাও অবশিষ্ট থাকত না!”

​গোলাম পরওয়ারের সাথে 'কারাবাস ও নামাজ'

​মিয়া গোলাম পরওয়ারের লেখা বইগুলোর প্রশংসা করে এ্যানি বলেন, “উনার সাথে আমার দীর্ঘদিনের আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া আর নামাজ পড়ার স্মৃতি রয়েছে। বর্তমান জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান তখন জেলে আমাদের ইমামতি করতেন। আমি সারাজীবন রাজপথের আন্দোলনে ব্যস্ত থাকায় ডায়েরি লিখলেও বই করার সুযোগ পাইনি, কিন্তু পরওয়ার ভাই সেই বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতাকে মলাটবন্দি করে মহৎ কাজ করেছেন।”

​অনুষ্ঠানে এ্যানি আহ্বান জানান যেন সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এই ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব আজীবন অটুট থাকে। জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় ছাত্রশিবিরের সভাপতিসহ বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন