সংবাদ শিরোনাম

রাজধানীতে রণক্ষেত্র: ১৯ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে প্রকৌশলী গ্রেপ্তার, নেপথ্যে ‘পচা রাজনীতি’ না কি দুর্ধর্ষ ছিনতাই?

 প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

রাজধানীতে রণক্ষেত্র: ১৯ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে প্রকৌশলী গ্রেপ্তার, নেপথ্যে ‘পচা রাজনীতি’ না কি দুর্ধর্ষ ছিনতাই?

​নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ১৪ মে, ২০২৬

​ঢাকার কদমতলীর ব্যস্ত রাজপথ তখন পড়ন্ত বিকেলের কোলাহলে মুখর। হঠাৎ করেই গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশ। কোনো সিনেমার শুটিং নয়, বরং অস্ত্রধারী একদল যুবকের তান্ডবে মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নতুন জুরাইনের আলমবাগ এলাকা। ব্যবসায়ী মো. হাসানের গাড়ি গতিরোধ করে চলে মুহুর্মুহু ফাঁকা গুলি, ধারালো অস্ত্রের কোপ আর ১৯ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের এক রুদ্ধশ্বাস নাটক।

​এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধানতম অভিযুক্ত আসাদুজ্জামান সাব্বির মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-১০। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃত সাব্বির পেশায় একজন প্রকৌশলী এবং ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনের ভাগনে।

​যেভাবে ঘটেছিল সেই রক্তক্ষয়ী বিকেল

​গত ৬ মে বিকেলে ব্যবসায়ী মো. হাসান ও তাঁর সহযোগীরা একটি প্রাইভেট কারে করে যাচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার বিবরণ অনুযায়ী, কদমতলী এলাকায় পৌঁছানো মাত্রই ২০-২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাঁদের পথরোধ করে। হামলাকারীদের হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র, সুইচ গিয়ার ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র।

​আকস্মিক এই হামলায় সন্ত্রাসীরা গাড়ির কাচ ভেঙে হাসানসহ অন্যদের টেনেহিঁচড়ে বের করে আনে। জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পিস্তল দিয়ে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। এরপর শুরু হয় বর্বরোচিত হামলা। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হাসান, রনি ও মোতালেবসহ অন্তত সাতজন গুরুতর আহত হন। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই গাড়িতে থাকা ব্যবসায়িক ১৯ লাখ টাকা লুট করে বীরদর্পে এলাকা ছাড়ে হামলাকারীরা।

​আদালতের আঙিনায় যুক্তিতর্ক

​বুধবার আদালতে শুনানিকালে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আসামি সাব্বিরের আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক দাবি করেন,

​"আমার মক্কেল সম্পূর্ণ নির্দোষ। তিনি একজন শিক্ষিত প্রকৌশলী। তাকে এবং তার পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।"

​অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষ এই জামিনের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী এই হামলায় সাব্বিরের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীন আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তবে একই মামলায় আত্মসমর্পণকারী অন্য এক আসামি, রবু মিয়া, জামিন লাভ করেছেন।

​সংসদ সদস্যের বয়ান: ‘পচা রাজনীতির শিকার’

​বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন। তিনি তাঁর ভাগনের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে জানান, এটি একটি সাজানো ঘটনা। সংসদ সদস্যের দাবি অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় তাঁর পক্ষে কাজ করতে এসেই সাব্বির একটি বিশেষ পক্ষের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে সাব্বির উপস্থিতই ছিল না। এটি মূলত ১ নম্বর আসামির সাথে বাদীর দ্বন্দ্বের ফল, যেখানে আমার ভাগনেকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।

​অনিশ্চিত গন্তব্যে তদন্ত

​তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জহিরুল ইসলাম জানান, ঘটনার নেপথ্যে প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। ১৯ জনের নামসহ অজ্ঞাত আরও অনেককে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। রাজধানীর বুকে এমন দুঃসাহসিক অপরাধের নেপথ্যে কোনো পেশাদার গ্যাং নাকি ব্যক্তিগত শত্রুতা কাজ করছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

​আপাতত প্রকৌশলী সাব্বিরের ঠিকানা এখন জেলহাজত, আর লুটের ১৯ লাখ টাকার হদিস পেতে মরিয়া প্রশাসন। কদমতলীর এই ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে বড় এক প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছে—নগরের নিরাপত্তা কি তবে এখন বুলেটের ডগায়?