সংবাদ শিরোনাম

​জাবিতে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা: মশাল মিছিলে প্রকম্পিত ক্যাম্পাস, প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি

 প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০৭:২৫ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

​জাবিতে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা: মশাল মিছিলে প্রকম্পিত ক্যাম্পাস, প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি

​নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার | ১৪ মে, ২০২৬

​অন্ধকার ফুঁড়ে জ্বলে উঠল হাজারো মশাল। সেই আগুনের লেলিহান শিখায় ধুয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আর শঙ্কা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নিঝুম রাতের স্তব্ধতা ভেঙে বুধবার রাতে জেগে উঠেছিল এক অন্যরকম প্রতিবাদের জোয়ার। এক ছাত্রীকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণচেষ্টার বীভৎস ঘটনার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। সহস্রাধিক নারী শিক্ষার্থীর গগনবিদারী স্লোগান আর পায়ের ধপধপ শব্দে প্রকম্পিত হয়েছে প্রক্টর কার্যালয় থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ভবন।

​সেই কালরাত ও আর্তনাদ

ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হলের পাশের নির্জন পথ ধরে যাচ্ছিলেন এক ছাত্রী। হঠাৎ পেছন থেকে এক আততায়ী ঝাপটে ধরে তাকে। গলায় ওড়না পেঁচিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের গভীর জঙ্গলে। সেই নির্জনতায় নিজের সম্ভ্রম আর জীবন বাঁচাতে ধস্তাধস্তি করতে থাকেন ভুক্তভোগী। তার মরণপণ আর্তনাদ কানে পৌঁছায় দূর দিয়ে যাওয়া কয়েকজন পথচারীর। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এলে পাশবিক লালসা চরিতার্থ করতে ব্যর্থ হয়ে অন্ধকারে গা-ঢাকা দেয় ঘাতক। বিধ্বস্ত অবস্থায় উদ্ধার করে ওই ছাত্রীকে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। প্রাথমিক তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, হামলাকারী সম্ভবত কোনো বহিরাগত।

​মশাল হাতে রাজপথে অদম্য নারীরা

এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ক্ষোভের অগ্নস্ফূরণ ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান এলাকা থেকে শুরু হয় নারী শিক্ষার্থীদের এক নজিরবিহীন বিক্ষোভ মিছিল। হাতে হাতে মশাল আর বুকে জমাট বাঁধা ক্ষোভ নিয়ে মিছিলে অংশ নেন প্রায় এক হাজার নারী শিক্ষার্থী। 'আমার সোনার বাংলায়, ধর্ষকের ঠাঁই নাই', 'ক্যাম্পাসে ধর্ষণ করে, প্রক্টর কী করে?'—এমন ঝাঁজালো স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাতের ক্যাম্পাস। মিছিলটি ছাত্রীদের ১০টি আবাসিক হল প্রদক্ষিণ করার সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তা বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এর আগে রাত ১০টার দিকে বটতলা এলাকা থেকে ছাত্রদের একটি সংহতি মিছিল এসে যুক্ত হয় নারী শিক্ষার্থীদের এই মিছিলে।

​দাবিনামায় উত্তাল প্রক্টর কার্যালয়

বিক্ষোভ মিছিলটি এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান ধর্মঘটে রূপ নেয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের নিরাপত্তার চরম ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নামমাত্র নিরাপত্তার আশ্বাস আর ফাঁকা বুলি দিয়ে তাদের ঘরে ফেরানো যাবে না। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন, যার মধ্যে প্রধানতম হলো—আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্ত নরপশুকে গ্রেপ্তার করতে হবে। এ ছাড়া নিরাপত্তার ব্যর্থতা স্বীকার করে প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলমসহ পুরো প্রক্টরিয়াল বডিকে পদত্যাগ করার আলটিমেটাম দিয়েছেন তারা। শিক্ষার্থীদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ এবং হেনস্তা রোধে একটি কার্যকর 'কুইক রেসপন্স টিম' গঠন করা।

​প্রশাসনের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি

গভীর রাত পর্যন্ত প্রক্টর কার্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের অবস্থান চলতে থাকে। সেখানে উপস্থিত প্রক্টর ও জাকসু নেতৃবৃন্দ শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযুক্তকে শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানানো হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, কেবল শনাক্তকরণ নয়, অপরাধীকে জনসমক্ষে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তাদের এই মশাল নিভবে না।

​রাত বাড়ার সাথে সাথে ক্যাম্পাসের মোড়ে মোড়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের আলোচনা আর স্লোগান চলছে। জাহাঙ্গীরনগরের সবুজ চত্বর এখন এক বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেও নতুন কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন না থাকলেও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।