বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যয়ের শঙ্কা: হুমকিতে মোবাইল ও এমএফএস সেবা

 প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যয়ের শঙ্কা: হুমকিতে মোবাইল ও এমএফএস সেবা

স্টাফ রিপোর্টার:

দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতি ও ডিজেল সংকটের প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে টেলিযোগাযোগ খাতে। মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)—সবকিছুই ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ডিজিটাল লেনদেন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।


নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ে জনদুর্ভোগ


দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন গ্রাম, উপশহর ও শহরতলীতে মোবাইল ফোন এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। যোগাযোগ, অনলাইন ব্যাংকিং, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার ব্যাপক। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে নেটওয়ার্ক বিভ্রাট বাড়ায় সাধারণ মানুষ পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঘনঘন লোডশেডিং ও দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে লেনদেন ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় আইপিএস ও ব্যাটারি ব্যাকআপও কার্যকর থাকছে না।

ডাটা সেন্টার ও টাওয়ার পরিচালনায় সংকট

ঢাকার নিকটবর্তী গাজীপুরে একটি মোবাইল অপারেটরের ডাটা সেন্টারে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে সঙ্গে সঙ্গে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। প্রায় এক ঘণ্টার লোডশেডিং সামাল দিতে খরচ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ ডিজেল—এক ক্ষেত্রে প্রায় ২২৭ লিটার পর্যন্ত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার ফলে ডাটা সেন্টারের যন্ত্রপাতিতে চাপ বাড়ছে, যা নেটওয়ার্ক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এ সময় টেলিকম টাওয়ারগুলো ব্যাটারির ওপর নির্ভর করে সচল থাকলেও পর্যাপ্ত চার্জ না থাকায় বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে টাওয়ার পরিচালনায় রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, ফলে নেটওয়ার্ক কাভারেজে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

এমএফএস খাতেও ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়লে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে এমএফএস খাতে। বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো সেবার ওপর নির্ভরশীল কোটি গ্রাহক দৈনন্দিন লেনদেনে সমস্যায় পড়তে পারেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে আরও তীব্র, যেখানে ব্যাংকিং সেবা সীমিত এবং এমএফএস-ই প্রধান ভরসা।

অপারেটর ও টাওয়ার কোম্পানির উদ্বেগ

টাওয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে টাওয়ার সচল রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে। তারা বিকল্প হিসেবে সৌর বিদ্যুৎ ও ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বাড়ালেও তা পর্যাপ্ত নয়।

মোবাইল অপারেটরদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে টেলিকম খাতের জন্য আলাদা জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি পরিবহন ও সংরক্ষণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান

অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব সতর্ক করে বলেছে, টেলিযোগাযোগ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি।

সম্ভাব্য সমাধান ও করণীয়

বিশেষজ্ঞরা সংকট মোকাবেলায় কয়েকটি তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন— টেলিকম খাতকে জরুরি সেবা হিসেবে ঘোষণা করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ডিজেল ও জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার এবং বিশেষ কোটা নির্ধারণ, টাওয়ারে সৌর শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং ব্যাটারি সক্ষমতা উন্নয়ন, ডাটা সেন্টারের জন্য আলাদা গ্রিড বা ব্যাকআপ ব্যবস্থা তৈরি, জ্বালানি পরিবহন ও সংরক্ষণে নিরাপত্তা জোরদার করা। 

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে টেলিযোগাযোগ খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দ্রুত নিরসন না হলে শুধু মোবাইল নেটওয়ার্ক নয়, বরং পুরো অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সময় থাকতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

Advertisement
Advertisement
Advertisement