মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে সার আমদানিতে বিঘ্ন,বিশ্বব্যাপী সারের বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার
আবু তৈয়ব তাইফুর রহমান:
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে সার সংকটে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনে জটিলতা তৈরি হওয়ায় সরকার বিকল্প উৎস থেকে বেশি পরিমাণ সার আমদানির কথা ভাবছে। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে চীন, মিসর ও রাশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ বিবেচনায় রয়েছে।
বর্তমানে ১৭টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে সার সরবরাহ করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে থেকে সময়মতো সার পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
অন্যান্য বিকল্প উৎস থেকে সার সংগ্রহ করতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান বলেন ‘বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ বিঘ্ন হচ্ছে। এতে আমাদের দেশের সার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরিয়া সারের দরপত্র আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছে।’
জুন পর্যন্ত সারের কোনো সংকট নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ের জন্য আমাদের হাতে প্রায় ৬ লাখ টন ইউরিয়া মজুত থাকা প্রয়োজন। গ্যাস সংকটের মধ্যে দেশে এই পরিমাণ সার উৎপাদন সম্ভব না।’
আমরা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন উৎস থেকে সার আমদানির চেষ্টা করছি। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিকল্প হিসেবে রাশিয়ায় সার খোঁজা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্রুনেই, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোও বিবেচনায় রয়েছে। অন্যদিকে সার রপ্তানি বন্ধ রেখেছে চীন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়া থেকে সার আমদানির সুযোগ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা যায় কি না, তা নিয়েও সরকার কাজ করছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যাতে নিরাপদে চালান আসতে পারে, সে কারণে ২৯ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইরানকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে, জানান তিনি।
একই দিন শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে অতিরিক্ত ২ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানির জন্য দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ফজলুর রহমান আশা করেছেন, ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি শিগগির উৎপাদন শুরু করবে এবং কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড ও শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড মে মাসের মধ্যে চালু হতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি শাখার অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম বলেন, ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সারের যা মজুত আছে, তাতে অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।
বাংলাদেশে বছরে ২৬ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি অংশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে আমদানি করতে হয়। এই সারের চালান হরমুজ প্রণালি দিয়ে দেশে আসে।
জুনের পর শুরু হবে আমন মৌসুম। দেশের মোট বার্ষিক উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ ধান আসে এই মৌসুমে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি শাখার গবেষণা কর্মকর্তা এজাজুল হক বলেন, বাংলাদেশ ইউরিয়ার বাইরে অন্যান্য সার রাশিয়া, কানাডা, মরক্কো, চীন, তিউনিসিয়া, জর্ডান ও মিসর থেকে আমদানি করে।
ইউরিয়া প্রধানত সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানি করা হয়, জানান তিনি।
এজাজুল হক আরও জানান, বর্তমানে দেশে ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১০০ টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ৮১ হাজার ২০০ টন টিএসপি, ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ টন ডিএপি ও ৩ লাখ ১৮ হাজার ২০০ টন এমওপির মজুত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় হরমুজ প্রণালি রুট। তবে রাশিয়া, কানাডা ও চীন থেকে আসা চালানে এ ধরনের সমস্যা নেই, যোগ করেন তিনি।
সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, নাইট্রোজেন সারের সূচক হিসেবে বিবেচিত মিশরের এফওবি (ফ্রি অন বোর্ড) ইউরিয়ার দাম যুদ্ধের আগে ৪০০-৪৯০ ডলার থেকে বেড়ে প্রতি টন প্রায় ৭০০ ডলারে পৌঁছেছে।
সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত। প্রধানত বোরো মৌসুমে দেশের মোট সারের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়।
ইউরিয়া ছাড়াও ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সার আমদানির জন্য মিসরের সঙ্গে চুক্তির পরিকল্পনা করছে সরকার।