গাজায় ধসে পড়ছে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, নিরাপদ আশ্রয় কোথায়
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
হাসপাতালের এক বিছানা থেকে আরেক বিছানায় ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন হায়াত আল-আজলা। এক স্বজনের হাত শক্ত করে ধরে আহতদের মুখগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি। খুঁজছিলেন তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ে দালিয়াকে।
বুধবার ভোরে পশ্চিম গাজা সিটির আল-সাদা ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে মা-মেয়েকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত ওই ভবনটি হঠাৎ ধসে পড়ে তাঁদের ওপর। ধসে অন্তত ২১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এরপর থেকে হায়াত জানেন না, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মেয়েটির অবস্থা কী।
৩৭ বছর বয়সী হায়াত বলেন, “আমি ঘুম থেকে উঠে ফোনটা দেখতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে হলো কোথাও কিছু ফাটছে। মনে হচ্ছিল, আমাদের নিচ থেকেই যেন কিছু ভেঙে পড়ছে।”
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ভবনটি ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন হায়াত। চারপাশে ধুলো আর অন্ধকার। কাছেই স্বজনদের আর্তচিৎকার, বাঁচার আকুতি।
তিনি বলেন, “আমি আমার ৭৪ বছর বয়সী বাবাকে ১২ বছরের ছেলে ইয়াসেরকে ডাকতে শুনছিলাম। ‘ইয়াসের, ইয়াসের’-তিনি ডাকছিলেন। তারপর তাঁর কণ্ঠ আর শুনতে পাইনি। আমি আতঙ্কিত হয়ে আমার চার সন্তানকে ডাকতে শুরু করি।”
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে প্রতিবেশী ও ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে হায়াত, তাঁর সন্তান এবং অন্য কয়েকজন বাসিন্দাকে বের করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভবনের আরও গভীরে আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে হায়াত বলেন, “আমার বাবা-মায়ের কণ্ঠ হারিয়ে গিয়েছিল। তাঁরা এমন জায়গায় ছিলেন, যেখানে ওপরের তলাগুলো একটির ওপর আরেকটি ধসে পড়েছিল। আমরা ভবনের হেলে পড়া অংশের কাছাকাছি ছিলাম। তাই অলৌকিকভাবেই বেঁচে গেছি।”
হায়াত জানান, তাঁর পরিবারের নয়জন সদস্য নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর বাবা-মা, চার ভাইবোন এবং তিন ভাগনে-ভাগনি। তাঁর চার সন্তান বেঁচে গেলেও মেয়ে দালিয়ার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ধসের আগে ছিল আতঙ্ক
ভবনটি আচমকা ধসে পড়লেও বিপদের আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। হায়াত বলেন, তাঁর মা ভবনটি নিয়ে ভয় পেতেন। তাঁর বাবাও অন্য কোথাও থাকার জায়গা খুঁজছিলেন।
যুদ্ধের আগের এক পর্যায়ে ইসরায়েলি হামলার কারণে গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকা ছেড়ে পরিবারটি মধ্য গাজার দেইর এল-বালাহে আশ্রয় নিয়েছিল। প্রায় দুই মাস আগে তারা আবার গাজা সিটিতে ফিরে আসে।
কিন্তু গাজায় পুনর্নির্মাণে নানা বিধিনিষেধ থাকায় বহু মানুষ এখনো তাঁবুতে বসবাস করছেন। অন্য কোনো উপায় না থাকায় হায়াতের পরিবারও একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের তৃতীয় তলার খালি ফ্ল্যাটে উঠে যায়।
হায়াত বলেন, “আমার বাবার এক বন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, তৃতীয় তলায় একটি খালি ফ্ল্যাট আছে। জায়গাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। কিন্তু আমার পরিবার তাঁবু ছেড়ে সেখানকার কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল।”
দুর্ঘটনার সময় ভবনটিতে পরিবারের অনেক সদস্যই ছিলেন। কারণ, পরের সপ্তাহে একটি পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। সেই উপলক্ষে সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
হায়াত বলেন, “আমরা কখনো ভাবিনি এমন বিপর্যয় আসবে। পুরো পরিবারের কেউ মারা গেছে, কেউ আহত হয়েছে।”
আল-শিফায় স্বজনদের অপেক্ষা
গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালে তখন নিহত ও নিখোঁজদের স্বজনদের ভিড়। কেউ শোকে কাঁদছেন, কেউ উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন, আবার কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা প্রিয়জনের কোনো খবরের আশায় দাঁড়িয়ে আছেন।
তাঁদের একজন উম মাহমুদ সাদা। সত্তরের কোঠায় থাকা এই নারী কাঁদছিলেন ছেলে মাহমুদ, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য। ৩৮ বছর বয়সী মাহমুদের ছয় মেয়ে ও এক ছেলে ছিল। তাঁদের কেউই বেঁচে নেই।
উম মাহমুদ জানান, মাহমুদ দক্ষিণ গাজায় বাস্তুচ্যুত অবস্থায় ছিলেন। প্রায় এক মাস আগে তিনি গাজা সিটিতে ফিরে আসেন।
তিনি বলেন, “রাস্তার মাঝখানে তাঁর একটি তাঁবু ছিল। সেখানে থাকতে থাকতে তিনি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। আর্থিক অবস্থাও খুব খারাপ ছিল। এক আত্মীয় তাঁকে এই জায়গাটির কথা বলেছিলেন। তাই সাময়িকভাবে এখানে উঠে এসেছিল। আমরা জানতাম না, এটাই তাঁর জীবনের শেষ ঠিকানা হবে।”
ছেলের সঙ্গে দুর্ঘটনার আগের দিনের স্মৃতিও মনে পড়ছিল তাঁর।
“গতকাল সে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। আমরা একসঙ্গে জোহরের নামাজ পড়েছি, খাওয়া-দাওয়া করেছি। তারপর সে চলে গেল,” বলেন তিনি। “আমাদের প্রিয় মানুষগুলো একে একে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন আমাদের হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। আমাদের সঙ্গেই কেন এমন হচ্ছে?”
যন্ত্রপাতির অভাবে ধীর উদ্ধারকাজ
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে সময় লাগছে মূলত ভারী যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য জরুরি সরঞ্জামের তীব্র সংকটের কারণে। গাজায় এসব সরঞ্জাম আনা এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমে ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স জানায়, ভবনের নিচে আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছাতে তাদের সদস্যরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেছেন। কিন্তু ভারী যন্ত্রপাতির বদলে সীমিত ও সাধারণ সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাঁদের। ফলে বিপুল পরিমাণ কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ভেতরে আটকে থাকা ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
৫৬ বছর বয়সী মানসুর বাকরুন তখন নিজের তাঁবুর সামনে বসেছিলেন। ভোর হওয়ার আগেই ভবনটি ধসে পড়ে।
তিনি বলেন, “ভবনটি এখান থেকে প্রায় ১৫০ মিটার দূরে। প্রথমে আমি দৌড়ে ফিরে যাই এবং আমার পরিবারকে সরে যেতে বলি।”
ধুলো কিছুটা কমে এলে তিনি আবার ভবনের দিকে ছুটে যান। তখন বাসিন্দারা ইতিমধ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন।
মানসুরের ভাষ্য, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ভবনটি দৃশ্যত ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। “প্রতিদিন ভবনটি থেকে কিছু না কিছু খসে পড়ত-দেয়ালের অংশ, পাথর,” বলেন তিনি।
তাঁর কথায়, “মানুষ চলে গিয়েছিল। কিন্তু যারা থেকে গিয়েছিল, তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। তাদের অন্য কোথাও যাওয়ার উপায় ছিল না।”
‘আমরা যাব কোথায়?’ভবনটির আশপাশে বসবাসকারী আরেক ব্যক্তি হুজাইফা মোহাম্মদও দীর্ঘদিন ধরে ধসের আশঙ্কায় ছিলেন।
তিনি বলেন, “প্রতিদিন আমি কল্পনা করি, এসব ভবন ধসে পড়ছে। প্রতিদিন পাথর আর দেয়ালের টুকরো পড়ছে। আর মানুষ প্রশ্ন করছে-আমরা যাব কোথায়?”
ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুদের বের করে আনার দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
হুজাইফা বলেন, “যখন দেখি একটা ছোট মেয়েকে মাথা থেঁতলে যাওয়া অবস্থায় বের করে আনা হচ্ছে, তখন নিজেকে প্রশ্ন করি-এটা যদি আমার মেয়ে বা ছেলে হতো?”
বছরের পর বছর ধরে গাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, ধসে পড়ার আশঙ্কা আর নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কবার্তার মধ্যেই বসবাস করছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেরই যাওয়ার মতো বিকল্প জায়গা নেই।
হুজাইফার প্রশ্ন, “আর কত দিন আমাদের এভাবে বাঁচতে হবে? আমরা কি শুধু বের হয়ে যা ঘটছে, তার নিন্দা করেই যাব? আমাদের সমাধান দরকার। এমন কেউ দরকার, যিনি আমাদের পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করবেন-আর কত দিন এভাবে চলবে?”
সূত্র: আলজাজিরা