ইউরোপের পরিবেশ সংকটের চিত্র দিলেন ফন ডার লায়েন, সমাধান অধর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইউরোপের জলবায়ু ও জ্বালানি সংকট কতটা গভীর, তার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন। তবে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট পথনকশা নিয়ে তাঁর বুধবারের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে খুব বেশি নতুন কিছু আসেনি।
এবারের প্রচণ্ড গরম গ্রীষ্ম এবং চার বছরের মধ্যে দ্বিতীয় জীবাশ্ম জ্বালানি সংকট ইউরোপের সামনে জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জকে আরও প্রকট করেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া প্রায় ৯০ মিনিটের ভাষণে ফন ডার লায়েন তাই জোর দিয়েছেন অসহনীয় তাপ, মহাদেশের বড় নদীগুলোর পানির স্তর কমে যাওয়া এবং ব্যয়বহুল আমদানি করা তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর।
তিনি বলেন, “এই গ্রীষ্ম ছিল সত্য উন্মোচনের গ্রীষ্ম। আমাদের মহাদেশের প্রায় কোনো অংশই এর হাত থেকে রেহাই পায়নি।”
তবে সংকটের কারণ ও তা মোকাবিলায় কী ধরনের নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা দেননি তিনি। কয়েকটি কারিগরি সমাধান, অস্পষ্ট কিছু উদ্যোগ এবং এরই মধ্যে কমিশন যেসব কাজ করেছে, তার পুনরুল্লেখই ছিল জ্বালানি ও জলবায়ু নিয়ে তাঁর বক্তব্যের বড় অংশ।
ফন ডার লায়েনের নেতৃত্বে ইউরোপীয় কমিশন জলবায়ু উষ্ণায়ন বাড়ানো গ্যাসের নিঃসরণ কমানো, প্রকৃতির অবক্ষয় ঠেকানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার জন্য বিস্তৃত নীতিকাঠামো তৈরি করেছে। তবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরেই অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ানোর যুক্তিতে পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষার কিছু নিয়ম শিথিল করার প্রবণতাও দেখা গেছে।
তাই কমিশনের ঘোষিত নীতিতে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কীভাবে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিংবা পরিবেশবিষয়ক নিয়ম শিথিল করার প্রক্রিয়া বন্ধ করা হবে—এমন প্রত্যাশা যারা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই হতাশ হয়েছেন।
ইউরোপীয় পরিবেশ ব্যুরোর মহাসচিব প্যাট্রিক টেন ব্রিঙ্ক বলেন, ফন ডার লায়েন ইউরোপের “গ্রীষ্মের সত্য” তুলে ধরে ঠিকই করেছেন। তাঁর ভাষায়, ইউরোপীয়রা আবারও তাপ, খরা ও ভয়াবহ দাবানলের একটি গ্রীষ্ম পার করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, “এই সত্য নিয়ে আমরা কী করব।”
ফন ডার লায়েনের প্রধান জবাব ছিল জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় ইউরোপের প্রস্তুতি আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে তিনি মূল নীতিতেই থাকার কথা বলেছেন। জ্বালানি নিয়ে, যা তাঁর ভাষণের শুরুতেই বড় জায়গা পেয়েছে এবং শীতের আগে ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়, নতুন কোনো বড় উদ্যোগ ঘোষণা করেননি। ইউরোপের প্রকৃতির অবনতির বিষয়েও বিস্তারিত কিছু বলেননি।
জ্বালানি নিয়ে পুরোনো সমস্যাই সামনে
ইউরোপের জ্বালানি খাতে তিনটি বড় সমস্যা চিহ্নিত করেছেন ফন ডার লায়েন-ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা, সীমিত বিদ্যুৎ গ্রিড এবং এর ফলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ বিলের চাপ।
সমাধান হিসেবে তিনি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো প্রযুক্তির বদলে বিদ্যুৎনির্ভর প্রযুক্তিতে যাওয়ার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, “আমাদের ইউরোপকে বিদ্যুতায়িত করতে হবে। ২০৪০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের অংশ দ্বিগুণ করা আমাদের লক্ষ্য। এতে ইউরোপ বছরে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির বিল ২৬০ বিলিয়ন ইউরো কমাতে পারবে।”
তবে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত বিদ্যুৎ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, গত বছর ইউরোপে ৮০ গিগাওয়াটের বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনক্ষমতা স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এর ছয় গুণ পরিমাণ উৎপাদনক্ষমতা এখনো গ্রিডে সংযুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
ফন ডার লায়েন বলেন, বিনিয়োগের গতি বাড়াতে হবে, গ্রিডে সংযোগ দ্রুত করতে হবে এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাঁর কথায়, “সংক্ষেপে, ইউরোপের ভবিষ্যৎকে বিদ্যুৎনির্ভর করে তুলতে হবে।”
শিল্প ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো তাঁর বক্তব্যের এই সাধারণ দিককে স্বাগত জানিয়েছে। ধাতু শিল্পের সংগঠন ইউরোপীয় অ্যালুমিনিয়াম বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ জ্বালানি মূল্য, বিদ্যুতায়নের গতি বাড়ানো এবং আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ইউরোপের নির্ভরতা কমানোর দিকে নজর দেওয়াকে তারা স্বাগত জানায়। তবে এসব ক্ষেত্রে তারা “সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ” দেখতে চায়।
ফন ডার লায়েন ইউরোপের ধীরগতির বিদ্যুতায়ন কীভাবে দ্রুত করা হবে, সে বিষয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব দেননি। অবশ্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ মজুতের ব্যবস্থা করতে একটি ইউরোপীয় “করপোরেশন” তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এর একটি কারণ হতে পারে, গ্রীষ্মের আগেই প্রকাশিত ‘ইলেকট্রিফিকেশন অ্যাকশন প্ল্যান’ এবং গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘ইউরোপীয় গ্রিডস প্যাকেজ’-এ এসব সমস্যার সমাধানে বেশ কিছু পদক্ষেপ রাখা হয়েছে।
তবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন কীভাবে আরও বাড়ানো হবে, ইউরোপ কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি আরও কমাবে কিংবা শীত মৌসুমে সম্ভাব্য গ্যাসের মূল্যসংকট ও ইউরোপীয় দেশগুলোর কমে যাওয়া গ্যাস মজুত কীভাবে সামাল দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে ভাষণে বিস্তারিত পরিকল্পনা দেননি ফন ডার লায়েন।
অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে ইউরোপের মিথেন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ শিথিল করার ঘোষণাও তিনি দেননি।
জলবায়ু নিয়ে লক্ষ্য অপরিবর্তিত
এরপর ইউরোপের জলবায়ু সংকটের জরুরি দিকগুলো তুলে ধরেন ফন ডার লায়েন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে ৩৫ হাজার মানুষের তাপজনিত মৃত্যুসহ নদীগুলোর রেকর্ড পরিমাণ পানিশূন্যতার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “এগুলো ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মের মাস-তবে সম্ভবত আগামী বছরগুলোর তুলনায় এগুলোই ছিল সবচেয়ে শীতল।”
বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ইউরোপের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি পরিকল্পনা নিয়ে কমিশন কাজ করছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি জলবায়ুজনিত দুর্যোগে মানুষের বীমা সুরক্ষা বাড়াতে ‘ক্লাইমেট ইন্স্যুরেন্স অ্যালায়েন্স’ গঠনের ঘোষণা দেন। একটি ‘হিট ওয়েভ প্ল্যান’-এর কথাও বলেন তিনি, যদিও এর বিস্তারিত জানাননি।
ইউরোপের জন্য একটি পৃথক অগ্নিনির্বাপণ বহর গঠনের প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছেন “জ্যেষ্ঠ অগ্নিনির্বাপক কর্মকর্তারা”-এমন কথাও জানান কমিশন প্রেসিডেন্ট।
তবে দাবানল ঠেকাতে বন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা কিংবা তীব্র গরমে শ্রমিকদের সুরক্ষায় শ্রম আইন শক্তিশালী করার মতো নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ তাঁর ভাষণে উঠে আসেনি।
দুর্যোগের পরিণতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতির ওপর এই জোরকে কমিশনের আগের নীতির তুলনায় একটি পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। আগে মূলত দুর্যোগের মাত্রা যাতে আরও না বাড়ে, সে জন্য কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর বেশি জোর দেওয়া হতো।
তবে ফন ডার লায়েন জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা থেকে সরে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি। তিনি বলেন, “ইউরোপ তার জলবায়ু লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারে, অবশ্যই থাকবে এবং থাকবে।”
এর অর্থ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু নীতিতে পিছু হটার পাশাপাশি উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও তাঁর নেই বলে মনে হচ্ছে।
প্রকৃতির সংকট প্রায় অনুল্লেখিত
দাবানল ও খরায় প্রকৃতির ক্ষয় নিয়ে কথা বললেও ইউরোপের বৃহত্তর পরিবেশগত সংকট-জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়া থেকে দূষণ পর্যন্ত-নিয়ে ফন ডার লায়েন বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেননি।
পরিবেশনীতি প্রসঙ্গে তাঁর ভাষণে নতুন একটি পানি উদ্যোগের কথা আসে। কৃষি খাতে পানির সংকট ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি। তবে এর আওতায় কী কী পদক্ষেপ থাকবে, তা স্পষ্ট করেননি।
এদিকে ব্যবসায়ী মহল, আইনপ্রণেতা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোর সরকার শিল্প ও জ্বালানি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য পানি ও আবাসস্থল সংরক্ষণবিষয়ক মূল নিয়মগুলো শিথিল করার দাবি জানিয়ে আসছে। কমিশন সেই দাবির দিকে এগোচ্ছে বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন ফন ডার লায়েন।
তিনি বলেন, অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করার জন্য প্রস্তাব আনা হবে। ইউরোপের কৌশলগত স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর অনুমোদন “ব্যাপকভাবে দ্রুত” করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ধরনের পদক্ষেপ ইউরোপের জ্বালানি রূপান্তরের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে এর সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রায় দেড় ঘণ্টার ভাষণে জ্বালানি ও জলবায়ু যথেষ্ট গুরুত্ব পেলেও বিষয়গুলো পুরো বক্তব্যজুড়ে একে অপরের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রযুক্তি প্রসঙ্গে ফন ডার লায়েন ইউরোপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু এআই অবকাঠামোর জলবায়ু, জ্বালানি ও পানির ওপর প্রভাব নিয়ে কোনো কথা বলেননি। ইউরোপ যখন একই সঙ্গে পানি সংকট, তাপপ্রবাহ ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন এই অবকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণ নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
গ্রিন পার্টির ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য সাসকিয়া ব্রিকমন্ট এ নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ভাষণে এআই ও এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনেক কথা থাকলেও ইউরোপে দ্রুত বাড়তে থাকা ডেটা সেন্টারগুলোর বিষয়ে ফন ডার লায়েন “একটি কথাও বলেননি”।
ব্রিকমন্টের মতে, এসব ডেটা সেন্টারের পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং নিঃসরণ নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে-বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে পানির ঘাটতি ও তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে এবং সেগুলো যথাযথভাবে সামাল দেওয়া হচ্ছে না।