ইরান যুদ্ধ ও শুল্কে চাপে ট্রাম্পের কৃষক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের কৃষক ম্যাট বেল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, জ্বালানি ও সারসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাবে এখন তাঁর খামার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
৫২ বছর বয়সী বেল ৩৪ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন। নর্থ ক্যারোলাইনার মধ্যাঞ্চলে এক হাজার একরের বেশি জমিতে তিনি সয়াবিন, ভুট্টা ও গম চাষ করেন। পাশাপাশি গরু পালনও করেন।
বেল বলেন, গত এক বছরে কৃষিকাজ নিয়ে এমন চাপ ও দুশ্চিন্তায় তিনি আগে কখনো পড়েননি। বাড়তি খরচ সামলাতে জমির ব্যবহার বদলানো, কৃষিযন্ত্রের আয়ু বাড়ানো এবং নিজেই সার উৎপাদনের মতো নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাঁর সন্তানরাও শরৎ মৌসুমে কুমড়া বিক্রি ও খড়ের গাড়িতে ভ্রমণের ব্যবস্থা করে অতিরিক্ত আয় করার চেষ্টা করছেন।
তবু খরচ কমানোর আর তেমন সুযোগ নেই বলে মনে করছেন বেল। তাঁর ভাষায়, জ্বালানি ও সার ছাড়া কৃষিকাজ চালানোই সম্ভব নয়।
ডিজেলের খরচ প্রায় দ্বিগুণ
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের কারণে সীমিতসংখ্যক তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত এবং সৌদি অবকাঠামোয় হামলার ঘটনাও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করেছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তেল পরিশোধন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম এখন প্রতি গ্যালনে প্রায় ৬ দশমিক ৪০ ডলার। এক বছর আগের তুলনায় তা প্রায় দ্বিগুণ। নর্থ ক্যারোলাইনাতেও বৃহস্পতিবার ডিজেলের গড় দাম রেকর্ড ৬ দশমিক ১৯ ডলারে উঠেছে।
বেল জানান, তাঁর সরবরাহকারী সকালে যে দাম জানান, বিকেলের মধ্যেই তা বেড়ে যায়। খামারের সব কৃষিযন্ত্র ডিজেলে চলে। তাঁর একটি বড় কৃষিযন্ত্রে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ ডলারের ডিজেল লাগে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
বছরের জন্য নির্ধারিত ৩৫ হাজার ডলারের জ্বালানি বাজেট আগস্টেই শেষ হয়ে গেছে। এখন পুরো বছরে জ্বালানির পেছনে ৫০ থেকে ৬০ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
শুল্কে বেড়েছে কৃষি উপকরণের দাম
শুধু জ্বালানি নয়, সার, রাসায়নিক, বীজ ও যন্ত্রাংশসহ কৃষিতে ব্যবহৃত প্রায় সব ধরনের উপকরণের দাম বেড়েছে। এর পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন শুল্কনীতির প্রভাব রয়েছে বলে বেল মনে করেন।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েনও সয়াবিন চাষিদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মে মাসে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন সয়াবিন কিনবে চীন।
২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি সয়াবিন কিনলেও মার্কিন সয়াবিনের ওপর চীনের ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে। চীনের এই শুল্ক ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্কের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে নেওয়া হয়েছিল।
বেলের মতে, উৎপাদন খরচ বাড়লেও চীনা বাজারে সয়াবিনের দাম সে অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে কৃষকেরা কোন দামে তাঁদের পণ্য বিক্রি করতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন উৎপাদকদের সংগঠন ট্রাম্পকে দেওয়া এক চিঠিতে চীনের ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ট্রাম্পকে ভোট দিয়েও হতাশ বেল
শুরুতে ট্রাম্পের নীতির প্রতি সমর্থন ছিল বেলের। এমনকি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে স্বল্পমেয়াদে পণ্যের দাম বাড়লেও ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো যদি সম্ভব হয়, সেই মূল্য দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হবে বলে তিনি মনে করেছিলেন।
কিন্তু এখন যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, একজন নাগরিক হিসেবে তাঁরা পুরো বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানতে পারছেন না।
কৃষি নীতিতেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ বেলের। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগে কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
কৃষকদের জন্য সরকারের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির ঘোষণাকে বড় মনে হলেও বেলের মতে, প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় সেই অর্থ যথেষ্ট নয়।
‘আমরা টিকে থাকার লড়াইয়ে’
বেল জানান, বাড়তি খরচ সামলাতে না পেরে তাঁর পরিচিত কিছু কৃষক ব্যবসা বন্ধ করার কথা ভাবছেন। তাঁর নিজের খামারও যদি বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বন্ধ করে দিতে হতে পারে।
তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু অর্থের নয়। কৃষিকাজের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের গর্ব ও পরিচয় জড়িয়ে আছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা না থাকলে একসময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।
আগামী নভেম্বরে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিজের অবস্থান বদলানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন বেল। তিনি নিজেকে রিপাবলিকান হিসেবে পরিচয় দিলেও এবার বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন।
কী করবেন কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে হলে-এই প্রশ্নের জবাবে বেল বলেন, তিনি জানেন না। কারণ কৃষিকাজই তাঁর জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ের পেশা।
সূত্র: সিবিএস নিউজ