সংবাদ শিরোনাম

গান ব্যবহারে প্রার্থী বাদ, রাশিয়ায় বিরোধীদের কোণঠাসা

 প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৪ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

গান ব্যবহারে প্রার্থী বাদ, রাশিয়ায় বিরোধীদের কোণঠাসা


আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
রাশিয়ার উদমুর্তিয়া প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিক ইয়া বোরোনিনা নির্বাচনী প্রচারে একটি জনপ্রিয় মার্কিন গান ব্যবহার করে এবার পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ হারিয়েছেন। আদালতের সিদ্ধান্তে তাঁকে ভোটের ব্যালট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

বোরোনিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে জর্জ থরোগুড অ্যান্ড দ্য ডেস্ট্রয়ার্সের ১৯৮২ সালের গান ‘ব্যাড টু দ্য বোন’ ব্যবহার করেছিলেন। উদমুর্তিয়ার সর্বোচ্চ আদালত গত সপ্তাহে রায় দিয়ে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করে।

আদালতের যুক্তি, গানটি ব্যবহারের মাধ্যমে বোরোনিনা রাশিয়ার মেধাস্বত্ব আইন লঙ্ঘন করেছেন। মামলাটি করেছিলেন বামপন্থী দল এ জাস্ট রাশিয়ার এক প্রার্থী। তাঁর দাবি ছিল, প্রচারের অর্থ ব্যবহারের নিয়ম মেনে গানটির স্বত্ব কেনা সম্ভব ছিল না, কারণ এর মূল্য মার্কিন ডলারে পরিশোধ করতে হতো।

বোরোনিনা পরে আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন। সেই আবেদনও খারিজ হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে নির্বাচনী দৌড় থেকে সরানোর জন্যই মামলাটি করা হয়েছিল এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে এমনকি শুনানির সময় সম্পর্কেও তাঁকে জানানো হয়নি।

ব্যালট থেকে বাদ পড়ছেন বহু বিরোধী প্রার্থী
বোরোনিনা রাশিয়ার ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যালট থেকে বাদ পড়া কয়েক ডজন বিরোধী প্রার্থীর একজন। এসব সিদ্ধান্তের ফলে ক্রেমলিন-সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ আরও সীমিত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উদারপন্থী ইয়াবলোকো দল। রাষ্ট্রীয় দুমার নির্বাচনে দলটির ২৯ জন প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজন নিজ নিজ অঞ্চলে দলের শাখার নেতৃত্ব দেন।

রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করা আন্দ্রাস টথ-সিফরা মনে করেন, ইয়াবলোকোর প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার ফলে প্রতিবাদী ভোটের সুযোগ কমছে এবং ভোটারদের উপস্থিতিও কমে যেতে পারে। তাঁর মতে, আইনসভা নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ কমানোর প্রবণতা রুশ কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের কৌশল।

রাশিয়ার ৪৫০ আসনের রাষ্ট্রীয় দুমার অর্ধেক আসন দলীয় তালিকার মাধ্যমে পূরণ হয়। যেসব দল জাতীয়ভাবে অন্তত ৫ শতাংশ ভোট পায়, তারা এই ব্যবস্থায় আসন পায়। বাকি ২২৫ আসন একক নির্বাচনী এলাকা থেকে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

ইয়াবলোকোর ওপর একের পর এক বাধা
গত মাসে রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট ইয়াবলোকোকে জাতীয় দলীয় তালিকা থেকে সরিয়ে দেয়। ফলে দলটি এখন কেবল একক নির্বাচনী এলাকাগুলোতে প্রার্থী দিতে পারছে।

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দলটির ৪৫টি অঞ্চলে ১০৬ জন প্রার্থী নির্বাচনী দৌড়ে ছিলেন। প্রচারণার শুরুতে এই সংখ্যা ছিল ১৩৫।

আঞ্চলিক নির্বাচনেও দলটির পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে। ৩৯টি আঞ্চলিক আইনসভা নির্বাচনের মধ্যে মাত্র একটিতে ইয়াবলোকোর প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। সাতটি অঞ্চলে আদালত দলটির তালিকা বাতিল করেছে।

সাইবেরিয়ার টমস্ক অঞ্চলে সর্বশেষ একটি মামলায় নির্বাচনী প্রচারে অর্থ ব্যয়ের অনিয়ম, মেধাস্বত্ব আইন লঙ্ঘন এবং নিষিদ্ধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভিযোগে ইয়াবলোকোকে আঞ্চলিক আইনসভা নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

দলটির প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত কারণগুলোর একটি ছিল বহু বছর আগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট। এসব পোস্টে প্রয়াত ক্রেমলিন সমালোচক আলেক্সেই নাভালনির ছবি, তাঁর নাম বা তাঁর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রকল্পের উল্লেখ ছিল।

এ ছাড়া বিদেশি শেয়ারবাজারে শেয়ার থাকা, অ্যাডলফ হিটলারের একটি ব্যঙ্গচিত্র-সংবলিত পোস্ট এবং নির্বাচনী নিবন্ধনের কাগজপত্রে ভুলের মতো কারণেও কয়েকজন প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক টথ-সিফরার মতে, প্রতিটি ছোট প্রার্থীকে সরিয়ে দেওয়ার সরাসরি রাজনৈতিক প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। বরং আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কর্মীরা ক্রেমলিনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের চেষ্টা হিসেবেও এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন।

কমিউনিস্ট প্রার্থীরাও চাপের মুখে
শুধু ইয়াবলোকো নয়, রাশিয়ার তথাকথিত ব্যবস্থার ভেতরের বিরোধী দলগুলোর প্রার্থীরাও এবারের নির্বাচনে চাপের মুখে পড়েছেন। এসব দল আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রেমলিনের বিরোধিতা করলেও রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে তাদের কার্যক্রম চালানোর অনুমতি রয়েছে।

নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, কমিউনিস্ট পার্টির অন্তত আটজন প্রার্থীকে রাষ্ট্রীয় দুমা বা আঞ্চলিক আইনসভার নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

তাঁদের মধ্যে নিকোলাই বোন্দারেঙ্কোর প্রার্থিতা বাতিল সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিষয়ক পোস্টগুলো ৩০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে বলে নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ প্রকল্পের এক বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে।

সারাতভ অঞ্চলের সাবেক আইনপ্রণেতা বোন্দারেঙ্কোর ইউটিউব অনুসারীর সংখ্যা ২০ লাখের বেশি। একটি টেলিভিশন বিতর্কে তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ে। এবারের নির্বাচনে অধিকাংশ প্রার্থী নির্ধারিত টেলিভিশন বিতর্কে অংশ না নেওয়ায় তাঁর উপস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমী।

তাঁকে বাদ দেওয়ার সরকারি কারণ হিসেবে কয়েক বছর আগের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে নাভালনির ছবি থাকার কথা বলা হয়েছে।

বোন্দারেঙ্কো এমন একটি নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যেটিকে রাষ্ট্রীয় দুমার বর্তমান স্পিকার ভিয়াচেস্লাভ ভোলোদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

চাপের মুখে নিজেই সরে দাঁড়ালেন প্রার্থী
কিছু প্রার্থী আবার চাপের মুখে নিজেরাই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কুরস্ক আঞ্চলিক পার্লামেন্ট নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী ছিলেন নিকোলাই স্ক্রিননিক। ইউক্রেনের দখলে থাকা সীমান্তবর্তী শহর সুদঝার ৭৫ বছর বয়সী এই বাসিন্দা চলতি মাসে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।

স্ক্রিননিকের দাবি, নিজের দল থেকেই তিনি চাপের মুখে পড়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে আঞ্চলিক সরকার, গভর্নর কিংবা ক্রেমলিন-সমর্থিত ইউনাইটেড রাশিয়া দলের কার্যক্রম নিয়ে করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট মুছে ফেলতে বলা হয়।

তিনি আরও দাবি করেন, তাঁকে বলা হয়েছিল এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করতে, যাতে দল কোনো সমস্যায় না পড়ে।

স্ক্রিননিকের মতে, ইউনাইটেড রাশিয়ার প্রার্থীর তুলনায় তাঁর নিজের জয়ের সম্ভাবনা বেশি ছিল। এ কারণে তাঁকে নির্বাচনে থাকতে দেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

রাশিয়ার এবারের নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের বাদ পড়ার ঘটনাগুলো তাই একই ধরনের নয়। কোথাও আদালতের মাধ্যমে প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, কোথাও পুরোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কারণ হয়েছে, আবার কোথাও দলীয় বা প্রশাসনিক চাপের অভিযোগে প্রার্থী নিজেই সরে দাঁড়িয়েছেন।

এর ফলে ক্রেমলিনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নির্বাচনী পরিসর আরও সংকুচিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।