সৌদি আরবকে ৪৮টি এফ-৩৫ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। প্রায় ২৪৩০ কোটি ডলারের এই চুক্তি কার্যকর করতে এখন মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, সৌদি আরবের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি বজায় রাখার মার্কিন নীতির সঙ্গে এই বিক্রয় চুক্তি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এফ-৩৫ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, সৌদি আরবকে এই বিমান দেওয়া হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসবে না। দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি অনুযায়ী, সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের তুলনায় ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
এই ঘোষণা এমন সময় এল, যখন ইয়েমেনে সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। বুধবার হুতিরা দাবি করে, মারিব শহরের আকাশে তারা সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।
হুতিরা একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে শহরটিতে আগুনে পুড়তে থাকা একটি যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষের সামনে তাদের যোদ্ধাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ধ্বংসাবশেষে সৌদি আরবের চিহ্ন ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
হুতিদের দাবি, স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে। সত্যি হলে এটি ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
এত দিন ইয়েমেনের আকাশে সৌদি আরব তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। দেশটি ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর পক্ষে নিয়মিত বিমান হামলা চালিয়ে আসছে।
বৃহস্পতিবারও সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে তিন শিশু রয়েছে।
সরাসরি যুদ্ধে নামতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র
হুতিদের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সরাসরি ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে সৌদি আরব। তবে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত হুতি, সৌদি আরব এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মধ্যকার সংঘাতে তারা সরাসরি সামরিকভাবে জড়াবে না।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে আরও মনোযোগ দিচ্ছে। এফ-৩৫ কেনার আগ্রহ দেশটির দীর্ঘদিনের।
চীনের কাছে প্রযুক্তি চলে যাওয়ার আশঙ্কা
সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে চীনের হাতে এই যুদ্ধবিমানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের অংশীদারত্বের মাধ্যমে বেইজিং এফ-৩৫-এর প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মার্কিন কংগ্রেসের গোয়েন্দা বিষয়ক কমিটির সদস্য রাজা কৃষ্ণমূর্তি এই কারণেই চুক্তির বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন সতর্ক করছে যে চীনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি পৌঁছে যেতে পারে, তখন এমন চুক্তি করা উচিত নয়।
ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে রিয়াদ
গত মাসে সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। মক্কা চুক্তি নামে পরিচিত ওই সমঝোতাকে ওয়াশিংটনের ওপর সামরিক নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার সৌদি প্রচেষ্টার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সৌদি আরব বহুদিন ধরেই এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে শুধু ইসরায়েলের কাছেই এই যুদ্ধবিমান রয়েছে। সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।
এর মধ্যেই সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে। ফলে রিয়াদকে এফ-৩৫ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তুরস্কও একসময় এফ-৩৫ কর্মসূচির অংশ ছিল এবং বিমানটির উন্নয়নেও কয়েকটি দেশের সঙ্গে কাজ করেছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়।
সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাব এখন মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায়। ফলে ইয়েমেনে চলমান সংঘাত, ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং চীনের সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সুবিধা-সব মিলিয়ে চুক্তিটি ওয়াশিংটনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা