গান-বাজনাহীন ওরসে ভক্তদের আক্ষেপ, তবুও শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার সিলেটে মানুষের ঢল

 প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন   |   সিলেট

গান-বাজনাহীন ওরসে ভক্তদের আক্ষেপ, তবুও শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার  সিলেটে মানুষের ঢল

​নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট :

আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত সিলেটের আকাশ-বাতাস এখন ‘লালে লাল, বাবা শাহজালাল’ ধ্বনিতে মুখরিত। ওলি-আউলিয়ার পুণ্যভূমি সিলেটে সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ৭০৭তম বার্ষিক ওরসকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব ধর্মীয় আবহ। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মাজারের প্রধান ফটক ছাড়িয়ে ভক্তদের ভিড় গিয়ে ঠেকেছে শহরের অলিগলিতে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষের হৃদয়ে এখন কেবলই মাজার জিয়ারত আর ভক্তি প্রকাশের আকুতি।

​মজারে গিলাফ চড়ানোর মাধ্যমেই শুরু হয় ওরসের মূল আনুষ্ঠানিকতা। প্রথা অনুযায়ী শুক্রবার সকালে প্রথমে মাজার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পুরনো গিলাফ বদলে নতুন গিলাফ পরানো হয়। এরপরই উন্মুক্ত হয় ভক্তদের গিলাফ প্রদানের সুযোগ। লাল কাপড়ে মোড়ানো বিশালাকার সব গিলাফ কাঁধে নিয়ে ভক্তদের মিছিল যখন মাজার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করছিল, তখন পুরো এলাকা এক লৌকিক উৎসবে রূপ নেয়। ঢাকা, সুনামগঞ্জসহ দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা কেউ গরু-খাসি, কেউবা শিরনি নিয়ে সমবেত হয়েছেন প্রিয় মুর্শিদের দরবারে। মাজারের ভেতরে-বাইরে নিরন্তর চলছে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত আর জিকির।

​তবে এবারের ওরসে প্রথাগত কিছু আয়োজনের অনুপস্থিতি নিয়ে ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে মাজারের পশ্চিমে ঝর্ণাপ্রান্ত, যেখানে প্রতি বছর মরমি গানের আসর বসত, সেখানে এবার কোনো গানের কাফেলা দেখা যায়নি। সুনামগঞ্জ থেকে আসা এক ভক্ত আক্ষেপ করে বলছিলেন, “ওরস তো কেবল ওয়াজ মাহফিল নয়, এটি ভক্তদের মনের খোরাক। এখানে জালালী গানের মাধ্যমে আমরা ভক্তি খুঁজি। সেই সুযোগ না পাওয়াটা কষ্টের।” ঢাকা থেকে আসা ভক্ত সোহেল মিয়াও একই সুরে বললেন যে, জালালী গান এই দরগার শত বছরের ঐতিহ্যের অংশ। গান-বাজনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওরসের সেই চিরচেনা প্রাণের স্পন্দন যেন কিছুটা ম্লান হয়ে পড়েছে। তারা আবারও পুরনো সেই ঐতিহ্যের প্রত্যাবর্তন চান।

​উৎসবের আমেজ থাকলেও নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ছাড় দিচ্ছে না প্রশাসন ও মাজার কর্তৃপক্ষ। মাজারের খাদেম সামুন মাহমুদ খান জানিয়েছেন, ভক্তদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিতে দুই হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে পাঠানো একটি গরুসহ ভক্তদের দান করা শতাধিক গরু ও খাসি এরই মধ্যে জবাই করা হয়েছে। মাজারের বিশাল ডেকচিগুলোতে রান্না হচ্ছে সুগন্ধি আখনি, যা শুক্রবার বাদ ফজর মোনাজাত শেষে আগত হাজার হাজার ভক্তের মাঝে শিরনি হিসেবে বিতরণ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

​সিলেটের নাগরিক আন্দোলনের নেতা আব্দুল করিম কিম এই উৎসবকে দেখছেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে। তার মতে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শাহজালাল (রহ.)-এর ওরস সিলেটের একটি লৌকিক মিলনমেলা। এই মিলনমেলাই সিলেটকে সারা বিশ্বের কাছে এক শান্তির জনপদ হিসেবে পরিচিত করেছে।

​শহরের প্রতিটি সড়ক এখন মুখরিত জিকির আর স্লোগানে। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৩টায় আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমেই এই দুই দিনব্যাপী আধ্যাত্মিক সম্মিলনের সমাপ্তি ঘটবে। দরগাহ-ই-হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মোতাওয়াল্লি ফতেউল্লাহ আল আমান এই বিশেষ দোয়া পরিচালনা করবেন, যেখানে দেশ ও জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে চোখের জলে বিদায় নেবেন দেশ-বিদেশ থেকে আসা অগুনতি আশেকান।

Advertisement
Advertisement
Advertisement