সংবাদ শিরোনাম

সয়াবিন উৎপাদন প্রযুক্তি

 প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৬, ০১:১৫ অপরাহ্ন   |   কৃষি

সয়াবিন উৎপাদন প্রযুক্তি

ডেক্স নিউজ: 

বাংলাদেশে সয়াবিন একটি সম্ভাবনাময় ফসল। আমিষ ও ভোজ্য তেল উৎপাদনে সয়াবিন এখন অনেক দেশেই একটি প্রধান ফসল। বাংলাদেশে সয়াবিন তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে বাজারজাত করা হচ্ছে। এতে দ্বিগুণ মূল্য দিয়ে সয়াবিনের চাহিদা পূরণ করতে হয়। সয়াবিনে ৪০-৪৫% আমিষ এবং ১৯-২২% তেল রয়েছে। অন্যান্য ডাল ও শুঁটি জাতীয় শস্যের তুলনায় সয়াবিন দ্বিগুণ আমিষ সম্পন্ন অথচ দাম কম। তাই স্বল্প মূল্যে তেল ও আমিষ সরবরাহের লক্ষ্যে আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে সয়াবিন চাষ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে সয়াবিনের হেক্টরপ্রতি ফলন ১.৫-২.৩ টন। মোট আবাদী জমির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর এবং উৎপাদন  প্রায় ৫৯ হাজার টন।

বাংলাদেশে যদিও সব জেলায় এর চাষ শুরু হয়নি। কিন্তু সব জায়গায় এটি চাষ করা সম্ভব। কেননা সয়াবিন বছরের সব সময় চাষ করা যায়। তবে রবি মৌসুমে ফলন বেশি হয়। নিচু জমিতেও এর চাষ করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোয় সয়াবিনের আবাদ বেশি হচ্ছে। জেলাগুলো হচ্ছে চাঁদপুর, লক্ষীপুর, নোয়াখালী, বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালী। এছাড়া ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলায় সয়াবিনের চাষ হয়ে আসছে। সয়াবিন মূলত অল্প সময়ের ফসল। মাত্র তিন মাসের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা যায়। এ ফসল চাষের ফলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। এর শিকড়ে একপ্রকার ব্যাকটেরিয়া (অণুজীব) নাইট্রোজেনকে গুটি আকারে ধরে রাখে। এর ফলে পরবর্তী ফসলে ইউরিয়া সারের অর্ধেক পরিমাণে প্রয়োজন হয়। এর রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম ও চাষাবাদ পদ্ধতিও সহজ। তাই চাষিরা বাজারক্ষেত্রে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে।

 

উন্নত জাতঃ সোহাগ (পিবি-১), বাংলাদেশ সয়াবিন-৪ (জি-২) , বিনা সয়াবিন-৩, বিনা সয়াবিন-৪, বারি সয়াবিন-৫, বারি সয়াবিন-৬, বিনা সয়াবিন-৫, বিনা সয়াবিন-৬, বিনা সয়াবিন-৭, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

 

উৎপাদন প্রযুক্তি

জমি তৈরি ও বীজের হারঃ সয়াবিন দোআঁশ ও এঁটেল দোআঁশ মাটিতে চাষের জন্য উপযোগী। খরিফ বা বর্ষা মৌসুমে জমি অবশ্যই উঁচু ও পানি নিকাশ সম্পন্ন হতে হবে। রবি মৌসুমে মাঝারী নিচু জমিতেও চাষ করা যায়। মাটির প্রকারভেদে জমিতে ৪-৫টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ভালভাবে ঝুরঝুরে ও আগাছামুক্ত করে বীজ বপন করতে হবে। জাত ভেদে শতক প্রতি ১৬০-৩২৫ গ্রাম বীজ প্রয়োজন।

 

বপন সময়ঃ বাংলাদেশে শীত (রবি) ও বর্ষা (খরিফ) উভয় মৌসুমেই সয়াবিন বপন করা যায়। পৌষ মাসে (মধ্য ডিসেম্বর থেকে মধ্য জানুয়ারি) বপন করা উত্তম। বর্ষা মৌসুমে শ্রাবণ থেকে মধ্য ভাদ্র পর্যন্ত (মধ্য জুলাই থেকে মধ্য আগষ্ট) বপন করা উত্তম।

 

বপন পদ্ধতিঃ সয়াবিন সারিতে বপন করা উত্তম। তবে কলাই বা মুগ ডালের মতো ছিটিয়েও বপন করা যায়। সারিতে বপন করলে সারি থেকে সারির দূরত্ব রবি মৌসুমে ৩০ সে.মি. এবং খরিফ মৌসুমে ৪০ সে.মি. রাখতে হয়। গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫-৬ সে.মি. রাখতে হয়।

 

সারের পরিমাণঃ সয়াবিনের জমিতে প্রয়োগের জন্য সার সুপারিশ নিম্নরূপঃ

 

সারের নাম

সারের পরিমাণ/হেক্টর

ইউরিয়া

৫০-৬০ কেজি

টিএসপি

১৫০-১৭৫ কেজি

এমওপি

১০০-১২০ কেজি

জিপসাম

৮০-১১৫ কেজি

বোরন (প্রয়োজনবোধে)

৮-১০ কেজি

 

সার প্রয়োগ পদ্ধতিঃ সবটুকু সার ছিটিয়ে শেষ চাষের সময় জমিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এক কেজি বীজের মধ্যে ৬৫-৭৫ গ্রাম অণুজীব সার ছিটিয়ে দিয়ে ভালোভাবে নাড়াচাড়া করতে হবে। এই বীজ সাথে সাথে বপন করতে হবে। অণুজীব সার ব্যবহার করলে সাধারণত ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয় না।

 

পানি সেচঃ বীজ বপনেরু এক মাস পর আগাছা দমন করে প্রথমে সেচ দিতে হবে। অর্থাৎ, প্রথম সেচ বীজ বপনের ২০-২৫ দিনের মধ্যে (ফুল ধরার পূর্বে) এবং দ্বিতীয় সেচ বীজ বপনের ৫৫-৬০ দিনের মধ্যে (শুঁটি গঠনের সময়) দিতে হবে।

 

অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যাঃ চারা গজানোর ২০-২৫ দিন পর আগাছা দমন করতে হবে। গাছ খুব ঘন থাকলে পাতলা করে দিতে হবে। প্রতি বর্গ মিটারে রবি মৌসুমে ৫০-৬০টি এবং খরিফ মৌসুমে ৪০-৫০টি চারা রাখা উত্তম। প্রয়োজনবোধে ১-২ বার নিড়ানী ও সেচ দিতে হবে। ‘জো’ আসার সাথে সাথে সারির মাঝে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে আলগা করে দিতে হবে।

 

অন্যান্য পরিচর্যা

পোকা ও রোগ দমনঃ  ছত্রাকের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হলে বপনের পূর্বে প্রোভেক্স-২০০ নামক ঔষধ দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। বিছা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে নাইট্রো ৫০৫ ইসি প্রতি ১ লিটার পানিতে ২ মিলি হিসেবে মিশিয়ে স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে ছিটিয়ে দিতে হবে।

 

সয়াবিনের রোগ দমন

  • সয়াবিনের উইল্ট রোগ দমনের জন্য আক্রান্ত গাছ অপসারণ করতে হবে। অধিক আক্রমণের ক্ষেত্রে ইপ্রিডিয়োন জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন রোভরাল ২০ গ্রাম ১০ লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে মাটিসহ গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।
  • সয়াবিনের পাতার রাস্ট রোগ দমনে প্রোপিকোনাজল জাতীয় ছত্রাকনাশক (যেমন টিল্ট ৫ মিলি/১ মুখ) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে ১০-১২ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
  • হলদে মোজাইক ভাইরাস রোগদমনে জমিতে সাদা মাছি, জাব পোকা দেখা গেলে (বাহক পোকা) ইমিডাক্লোরোপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক (যেমন এডমায়ার অথবা টিডো ১০ মিলি ২ মুখ) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে। সকাল বেলা গাছে ছাই ছিটিয়ে দিলে এই পোকা গাছ থেকে পড়ে যাবে।

 

সয়াবিনের ক্ষতিকর পোকা দমনঃ বাংলাদেশে সয়াবিনের ৩০টি ক্ষতিকর পোকা সনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে বিছাপোকা, সাধারণ কাটুপোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, কাণ্ডের মাছি পোকা প্রধান।

 

বিছাপোকাঃ সয়াবিনের বিছাপোকা ছোট ছোট কীড়াগুলো একত্রে দলবদ্ধভাবে পাতার সবুজ অংশ খেয়ে জালিকা সৃষ্টি করে। পরে বয়স্ক কীড়া পাতা, ফুল ও নরম কাণ্ড পেটুকের মতো খেয়ে ক্ষতি করে। ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফুল ও ফল ধারণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং ফলন কমে যায়।

 

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ

  • রাতে আলোর ফাঁদ দ্বারা মথকে আকৃষ্ট করে ধরে মারা যায়
  • প্রাথমিক অবস্থায় দলবদ্ধ কীড়াসহ আক্রান্ত পাতা হাত দ্বারা ধ্বংস করে দমন করা যায়
  • ৫০ গ্রাম আধাভাঙ্গা নিম বীজ ১ লিটার পানিতে ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে ২ গ্রাম ডিটারজেন্ট মিশিয়ে ছেঁকে ১০ দিন অন্তর ২ বার স্প্রে করে পোকা দমন করা যায়
  • আক্রমণ খুব বেশি হলে নাইট্রো (সাইপারমেথ্রিন +ক্লোরোপাইরিপাস) ৫০৫ ইসি ২ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত ক্ষেতে ১০ দিন অন্তর ২ বার ছিটিয়ে পোকা দমন করা যায়।

 

সাধারণ কাটুই পোকাঃ  এ পোকা তেল, ডাল জাতীয় শস্য, সবজি ইত্যাদির চারা অবস্থায় গোড়া কেটে ও পাতা খেয়ে প্রচুর ক্ষতি করে। এদের কীড়া সয়াবিন গাছের চারা অবস্থা থেকে শুরু করে পরিপক্ক অবস্থা পর্যন্ত পাতা, কাণ্ড, ফুল ও ফল পেটুকের মতো খেয়ে মারাত্মকক ক্ষতি করে। দিনে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে, রাতে লক্ষ লক্ষ কীড়া দলবদ্ধভাবে ফসলে আক্রমণ করে খেয়ে ক্ষতি করে। সাধারণত চারা অবস্থায় ও গাছের বৃদ্ধি পর্যায়ে এদের আক্রমণ বেশি দেখা যায়।

 

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • আলোর ফাঁদ দ্বারা মথ ধরে মারা যায়
  • প্রাথমিক অবস্থায় এ পোকার কীড়া দলবদ্ধভাবে একটি গাছের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে। তখন হাত দ্বারা পাতাসহ কীড়া সংগ্রহ করে মেরে দমন করা যায়।
  • আক্রান্ত ক্ষেতে বিঘাপ্রতি ৮/১০টি ডাল পুঁতে দিলে পোকাভোজী পাখি কীড়া খেয়ে পোকা দমন করতে পারে।
  • আক্রমণ বেশি হলে রিপকার্ড-১০ ইসি বা ডারসবান-২০ ইসি ২ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত ক্ষেতে ১০ দিন অন্তর ২ বার স্প্রে করে পোকা দমন করা যায়।
  • ফসল বপনের পর ফাঁদ ব্যবহার করলে প্রচুর সংখ্যক পুরুষ পোকা আকৃষ্ট হয়ে ফাঁদে পড়ে মারা যায়।

 

পাতা মোড়ানো পোকাঃ এ পোকার মথ হলদে বাদামী বর্ণের। এদের পাখায় ছোট ছোট কালো দাগ থাকে। এদের কীড়া লম্বা, সবুজ বর্ণের গায়ে কালো ফোটা ফোটা দাগ থাকে এবং মাথা হালকা লালচে বর্ণের। এ পোকার কীড়া গাছের অগ্রভাগের এবং পার্শ্বের কচি ও অর্ধকচি পাতা গুটিয়ে বা মুড়িয়ে ভিতরে বসে খায়। ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফুল-ফল ধারণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং ফলন কমে যায়। একটি গাছে ৪-৫টি মুড়ানো পাতাসহ কীড়া থাকতে পারে। ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল মাস পর্যন্ত অর্থাৎ গাছের অঙ্গজ বৃদ্ধির সময় থেকে পরিপক্ক অবস্থা পর্যন্ত এদের আক্রমণ হয়ে থাকে। বর্ষা বা খরিফ-২ মৌসুমে এদের আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে।

 

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনাঃ

  • মোড়ানো পাতাসহ কীড়া সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে।
  • প্রতি বিঘায় ৮-১০টি কাঠি পুঁতে পাখি বসার সুযোগ করলে পোকাভোজী পাখি কীড়া খেয়ে কমাতে পারে।
  • প্রতিরোধী জাত যেমন সোহাগ এবং ‘বারি সয়াবিন-৬’ চাষ করলে আক্রমণ কিছুটা কম হয়।
  • সময়মতো আগাছা দমন, পাতলাকরণ ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করলে পোকার আক্রমণ কমে যায়।
  • আক্রমণ বেশি হলে সুমিথিয়ন ৫৭ ইসি বা সেভিন ২০ ইসি ২ মিলি বা পারফেকথিয়ন ৪০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত জমিতে ১০ দিনের ব্যবধানে ২ বার স্প্রে করলে পোকার আক্রমণ কমে যায়।

 

সতর্কতাঃ বালাইনাশক/কীটনাশক ব্যবহারের আগে বোতল বা প্যাকেটের গায়ের লেবেল ভালো করে পড়ুন এবং নির্দেশাবলি মেনে চলুন। ব্যবহারের সময় নিরাপত্তা পোষাক পরিধান করতে হবে। ব্যবহারের সময় ধুমপান এবং পানাহার করা যাবেনা। বালাইনাশক ছিটানো জমির পানি যাতে মুক্ত জলাশয়ে না মেশে তা লক্ষ্য রাখুন। বালাইনাশক প্রয়োগ করা জমির ফসল কমপক্ষে সাত থেকে ১৫ দিন পর বাজারজাত করতে হবে।

 

পরিপক্কতা ও ফসল সংগ্রহঃ সয়াবিন বীজ বপন থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত ৯০-১২০ দিন সময় লাগে। ফসল পরিপক্ক হলে শুঁটিসহ গাছ হলদে হয়ে আসে এবং পাতা ঝরে পড়তে শুরু করে। এ সময় গাছ কেটে ফসল সংগ্রহ করতে হয়। সংগ্রহের পর তিন থেকে চার দিন ভালোভাবে রোদে শুকানোর পর লাঠি দিয়ে হালকাভাবে পেটালে সয়াবিনের গাছ থেকে দানা আলগা হয়ে পড়বে। সয়াবিন কড়া রোদে না শুকানোই ভালো। মাড়াই হয়ে গেলে আবারও রোদে শুকিয়ে গ্রেডিং করে গুদামজাত করতে হবে। তবে গুদামজাতের আগে সয়াবিনের দানা থেকে মাটি, খড়, ময়লা প্রভৃতি বেছে পরিষ্কার করে নিতে হবে। গুদামজাত করার পর লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে বাতাস না ঢোকে। তা না হলে পণ্যের উজ্জ্বল রং ও আকার নষ্ট হয়ে যাবে। তাছাড়া পোকামাকড় থেকে রক্ষার জন্য পাত্রের নিচে ও ওপরে নিমপাতা গুঁড়ো করে দিতে হবে। বীজ সংরক্ষণের জন্য ড্রাম, টিন, পলিথিন প্রভৃতি ব্যবহার করা যেতে পারে।


(তথ্য সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস)