জিরা চাষ পদ্ধতি

 প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৪:১৯ অপরাহ্ন   |   কৃষি

জিরা চাষ পদ্ধতি

জিরা আমাদের প্রতিদিন ব্যবহারের একটি সুগন্ধি ও সুস্বাদু মসলা উপাদান। জিরা (Apiaceae) পরিবারভুক্ত বর্ষজীবী বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ, এর বৈজ্ঞানিক নাম Cuminum cyminum L. মিশর, সিরিয়া, তুর্কিস্থান ও মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল জিরার আদি নিবাস। জিরা মসলা হিসাবে বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্যে, সবজিতে, মাছ-মাংসে, আচার-চাটনিতে, ঘি, সুপসহ বিভিন্ন ধরনের রুটি, কেক ও বিস্কুট তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। ঔষধি হিসেবেও জিরার বেশ ব্যবহার রয়েছে। বারি জিরা-১ নামে জাতীয় বীজ বোর্ড কতৃক ২০২২ সালে নিবন্ধিত হয়। জাতটি দেশে জিরা উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখবে। বারি জিরা-১ শীতকালে চাষ করা হয়। ইহা ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ায় চাষের উপযোগী। অঙ্কুরোদগমের জন্য ১৬-২০০ সেলসিয়াস এবং গাছের বৃদ্ধির জন্য ২০-৩০০ সেলসিয়াস তাপমাত্রা দরকার হয়।

 

বারি জিরা-১

১. গাছ মাঝারি লম্বা ও ঝোপালো, উচ্চ্তা ৪০-৫০ সে.মি., গাছের পাতার রঙ গাঢ় সবুজ। 

২. গাছে প্রাথমিক শাখার সংখ্যা ৫-৬টি, আম্বেলের সংখ্যা ৭০-১০০টি, প্রতি আম্বেলে আম্বেলেটের সংখ্যা ৫-৬টি এবং প্রতিটি 

    আম্বেলেটে বীজের সংখ্যা ৫-৭টি। 

৩. এ জাতের জিরার জীবনকাল প্রায় ১০০-১১০ দিন (নভেম্বর-মার্চ)। 

৪. বীজ সরু ও লম্বা। এই জাতের জিরা বাজারে প্রাপ্ত জিরা অপেক্ষা অধিক সুগন্ধী। 

৫. হেক্টর প্রতি ফলন ৫৫০-৬০০ কেজি (শুষ্ক অবস্থায়)।

 

উপযোগিতা: সুনিষ্কাশিত অধিক জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দোআঁশ হতে বেলে দোআঁশ মাটি বাংলাদেশে জিরা চাষের জন্য উপযোগী। মাটির pH ৬.৮-৮.০ জিরা চাষের উপযোগী। অধিক ক্ষারীয় বা  অম্লীয় মাটিতে জিরা চাষ ভাল হয় না। বাংলাদেশের যে সব এলাকায় শীতকালে আদ্রতা কম, বৃষ্টিপাত ও কুয়াশা মুক্ত এবং আবহাওয়া শুষ্ক থাকে সেসব এলাকায় জিরা চাষের জন্য উপযুক্ত। বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চল, বাংলাদেশের বিভিন্ন চর অঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল বারি জিরা-১ চাষের উপযোগী। 

 

আর্থ সামাজিক পেক্ষাপট: নিত্যদিনের ব্যবহারকৃত সমুদয় জিরা আমরা আমদানি করে থাকি যার জন্য প্রতি বছর আমাদেরকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। বারি জিরা-১ চাষের মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন মিটানোর সাথে সাথে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় সম্ভব। 

 

উৎপাদন প্রযুক্তি

 

বপনের সময়: নভেম্বর ১ম সপ্তাহ হতে ৩য় সপ্তাহ পর্যন্ত। 

 

মাটি: সুনিষ্কাশিত অধিক জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দোআঁশ হতে বেলে দোআঁশ মাটি।

 

বীজহার: ছিটিয়ে বীজ বপন করলে হেক্টরপ্রতি ১২-২৫ কেজি ও সারিতে বপন করলে ৮-১০ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। 

 

বপন পদ্ধতি: রিজ এন্ড ফারো পদ্ধতি, ৩০ সেমি. x ৮ সেমি.। 

 

অঙ্কুরোদগম পদ্ধতি: জিরা বীজ স্প্রাউটিং করে নিয়ে বপন করলে অঙ্কুরোদগম নিশ্চিত হয়। বীজ বপনের পূর্বে রো (সারি) কোদাল দিয়ে সামান্য ০৮-১.০০ সেমি. গভীর করে তৈরি করে সেখানে বীজ বপন করতে হবে। বীজ বপনের পর সামান্য ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে 

বাংলাদেশে বারি জিরা-১ চাষের সম্ভাবনাময় এলাকা: জিরা চাষে অন্ত্যন্ত কম পরিমাণে পানির প্রয়োজন হয়। বৃহত্তর বরেন্দ্র এলাকা (রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ) বাংলাদেশের বিভিন্ন চর এলাকা এবং উত্তরাঞ্চল বারি জিরা-১ চাষের জন্য উপযোগী। 

 

রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা: জিরা বপনের ২৫-৩০ দিন পর ঢলে পরা রোগের আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়, তখন হেক্টরপ্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম কার্বেনডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (অটোস্টিন ৫০ ডিএফ, নোইন ৫০ ডিএফ) মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর ২-৩ বার বিকালে গাছের গোড়ায় ও মাটিতে স্প্রে করতে হবে। গাছের বয়স ৪৫-৫০ দিন বা ফুল আসার পূর্বে অল্টারনারিয়া ব্লাইট রোগ হয়। Alternaria alternata নামক ছত্রাকের আক্রমণে এই রোগ হয়। এই রোগ হলে প্রথমে পাতার পচন ধরে। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানির সাথে ১ মিলি এমিষ্টারটপ মিশিয়ে ৭-৮ দিন পর পর বিকেলে সমস্ত গাছে ৫-৬ বার স্প্রে করতে হবে। বাংলাদেশে জিরা চাষে পোকার আক্রমণ ততটা লক্ষণীয় নয়। 

 

ফলন: বারি জিরা-১ এর ফলন ৫৫০-৬০০ কেজি/হেক্টর।

তথ্য সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস