চিনা চাষ

 প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬, ০১:২৪ অপরাহ্ন   |   কৃষি

চিনা চাষ


বর্তমানে বাংলাদেশে অপ্রধান ফসল হিসেবে চিনার চাষ করা হয়ে থাকে। অনুর্বর মাটিতে ও চরাঞ্চলে এ ফসলটি বেশি চাষ হয়ে থাকে। চিনা দ্বারা খিচুড়ি, পায়েশ, মোয়া, নাড়ু ও পিঠা তৈরি করা যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম চিনায় ১১-১৩% প্রোটিন, ৫-৭% ডায়েটারি ফাইবার, ৩০-৩২% ক্যালসিয়াম, ২.৫-৩% আয়রন, ০.২-০.৩ বেটা-গ্লুকান, ৫১-৫৫% গ্লাইসেমিক ইনডেক্স উপাদান আছে।


বারি চিনা-২: চিনা একটি বহুমুখী শস্য যা দানাশস্য, পাখি খাদ্য ও মিষ্টি জাতীয় খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। গাছের উচ্চতা ৮২-৮৪ সে.মি.। শীষ ১৮-২১.৬ সে.মি.। বীজ ডিম্বাকৃতি, উজ্জ্বল বাদামি কালচে রং এর এবং বীজ থেকে ছাড়ানো চাল হলুদ বর্ণের। হাজার দানার ওজন ৫-৫.৫ গ্রাম। বাংলাদেশের সকল এলাকাতে এই জাতটি চাষ করা যায়। 

 


চিনাভিত্তিক শস্য পরিক্রমা:



এলাকা

শস্য পরিক্রমা


খরিপ- ১


খরিপ -২

রবি


পাবনা, যশোর, কুষ্টিয়া অঞ্চল



আউশ/পাট


রোপা  আমন


চিনা


রংপুর ও জামালপুর অঞ্চল



চিনা


মাসকলাই


চিনা


দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় অঞ্চল



পাট/আউশ


রোপা আমন


চিনা


কুমিল্লা অঞ্চল



রোপা আউশ


রোপা আমন


চিনা


রাজশাহী অঞ্চল



চিনা


পতিত


বোরো

 

উৎপাদন প্রযুক্তি 


মাটি: পানি জমে না এমন বেলে দোআঁশ মাটি চিনা চাষের জন্য বেশ উপযোগী।

বপনের সময়: মধ্য-কার্তিক থেকে পৌষ মাস (নভেম্বর থেকে মধ্য-জানুয়ারি)। 

বীজের হার: চিনা বীজ ছিটিয়ে এবং সারিতে উভয় পদ্ধতিতেই বোনা যায়। ছিটিয়ে বুনলে হেক্টরপ্রতি ২০ কেজি বা বিঘাপ্রতি ২.৬ কেজি এবং সারিতে বুনলে হেক্টরপ্রতি ১৮ কেজি বা বিঘাপ্রতি ২.৪ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। সারিতে বীজ বুনলে ২ সারির মাঝে দূরত্ব হবে ২০-৩০ সেমি.। সারিতে চারা গজানোর পর ৬-৮ সেমি. দূরত্বে একটি করে চারা রেখে বাকি চারা তুলে ফেলতে হবে। 

সারের পরিমাণ: সাধারণত অনুর্বর জমিতে চিনার চাষ করা হলেও সার প্রয়োগ করে ফলন বাড়ানো যায়।

 


সারের নাম


পরিমাণ/হেক্টর


পরিমাণ/বিঘা



বিশেষভাবে লক্ষণীয়


ইউরিয়া


১৩০-১৭০ কেজি


১৭.৩- ২২.৬ কেজি


টিএসপি এর পরিবর্তে


ডিএপি ব্যবহার করলে প্রতি


কেজি ডিএপির জন্য ৪০০


গ্রাম ইউরিয়া কম ব্যবহার


করতে হবে।


টিএসপি / ডিএপি


১০০-১২৫ কেজি


১৩.৩- ১৬.৬ কেজি


এমওপি



৮০-৯০ কেজি


১০.৬-১২ কেজি


জিপসাম



৪৫-৫৫ কেজি


৬-৭.৩ কেজি


জিংক সালফেট



৩-৪ কেজি


০.৫৩ কেজি

 

সার প্রয়োগ পদ্ধতি 


সেচ বিহীন চাষে সম্পূর্ণ সার শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু সেচের ব্যবস্থা থাকলে শেষ চাষের সময় অর্ধেক ইউরিয়া এবং সবটুকু টিএসপি ও এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া বীজ বপনের ৩৫-৪০ দিন পর উপরি প্রয়োগ করতে হবে।


পানি সেচ: মাটিতে রসের অভাব হলে ১-২টি হালকা সেচ দেওয়া যেতে পারে।


রোগবালাই ও দমন ব্যবস্থা: চিনার এ জাতটিতে সাধারণত রোগবালাই দেখা যায় না। পোকামাকড় চিনায় পোকামাকড়ের আক্রমণ কম। পোকার আক্রমণ দেখা দিলে আক্রমণের ব্যাপকতা বুঝে কার্বোফুরান ৫ জি (তারপোকার ক্ষেত্রে) জাতীয় দানাদার কীটনাশক (যেমন ফুরাডান, ব্রিফার ইত্যাদি) হেক্টর প্রতি ১৮ কেজি হারে বীজ বপনের সময় প্রয়োগ করতে হবে এবং কাটুই পোকার জন্য প্রতি লিটার পানির সাথে ৫ মিলি ক্লোরোপাইরিফস ২০ ইসি জাতীয় কীটনাশক (ডার্সবান/পাইরিফস/অন্য নামের) মিশিয়ে চারাগাছগুলোর গোড়ায় মাটি ভিজিয়ে ভালোভাবে স্প্রে করে দিয়ে এ পোকার আক্রমণ কমানো যায়। 


ফসল সংগ্রহ, মাড়াই ও সংরক্ষণ: চীনার শীষের দুই-তৃতীয়াংশ যখন খড়ের রং ধারণ করলে তখন বুঝতে হবে ফসল কাটার সময় হয়েছে। এ সময় শীষসহ গাছ কেটে তা রোদে শুকাতে হবে এবং লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বা গরু দ্বারা মাড়িয়ে দানা ছাড়াতে হবে। ছাড়ানো দানা ভালভাবে রোদে শুকিয়ে ঠান্ডা করে মাটি বা টিনের পাত্রে মুখ বন্ধ করে রাখতে হবে যাতে বাইরের বাতাস পাত্রে ঢুকতে না পারে। এছাড়া মোটা পলিথিন ব্যাগে ও বীজ সংরক্ষণ করা যায়।

 

চীনার দানা খোসা মুক্তকরণ: স্থানীয়ভাবে ঢেঁকি বা কাইলে ছেটে খোসামুক্ত দানা বা চিনার চাল বের করা যায়। তাছাড়া মেশিনের মাধ্যমে ও বীজ হতে খোসা ছাড়ানো যায়। ১০০ কেজি চীনা হতে প্রায় ৭৫ কেজি খোসামুক্ত দানা পাওয়া যায়। সিদ্ধ ও আতপ এ দুই প্রকারের দানাই প্রস্তুত করা যায়।

 

ফলন: উপযুক্ত যত্ন ও পরিচর্যায় হেক্টরপ্রতি ২.২৫ থেকে ২.৫ টন পর্যন্ত ফলন দেয়।

 

তথ্যসুত্র: কৃষি প্রযুক্তি হাতবই, দশম সংস্করণ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট।