ঐতিহ্যের স্মারক থেকে আধুনিক নেটওয়ার্ক: নানা নতুন সেবা সত্ত্বেও কেন কমছে না বাংলাদেশ ডাক বিভাগের আর্থিক ঘাটতি?
ছবি- সংগৃহীত
হলুদ খামের ভাঁজে প্রিয় মানুষের চিঠি বা ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার মিষ্টি শব্দ—বাঙালির এই নস্টালজিক স্মৃতি আজ কেবলই অতীত। প্রযুক্তির ছোঁয়া ও মুঠোফোনের ভিড়ে ব্যক্তিগত চিঠির প্রচলন ফুরিয়ে গেলেও থেমে নেই ডাক বিভাগ। চিঠির খাম থেকে শুরু করে সরকারি নথি, আদালতের কাগজপত্র, পাসপোর্ট, ভূমির রেকর্ড এবং ই-কমার্সের পার্সেল—বহুমুখী সেবা যুক্ত করে নিজেকে টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি। তবে একের পর এক নতুন সেবা যুক্ত হলেও কমার লক্ষণ নেই এর ব্যয়-আয়ের বিশাল ফারাকের।
আয়ের চেয়ে ব্যয় বহুগুণ বেশি: একনজরে আর্থিক চিত্র
ডাক বিভাগের সেবার পরিধি বাড়ার সাথে সাথে রাজস্ব আয়ও কিছুটা বেড়েছে। তবে তা পরিচালনার বিশাল খরচের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
- ক্রমবর্ধমান আয়: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডাক বিভাগের আয় ছিল প্রায় ২১৯ কোটি টাকা। পরবর্তী অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৩ কোটিতে এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত তিন বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা।
- বিশাল প্রশাসনিক ব্যয়: আয়ের গ্রাফ উর্ধ্বমুখী হলেও প্রতি বছর ডাক বিভাগের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে।
- বাজেটের সিংহভাগ যায় বেতনে: এই বিশাল ব্যয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশই চলে যায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং পেনশন খাতে। এর মধ্যে শুধু বেতন-ভাতাতেই খরচ হয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা, আর পেনশন ও আনুতোষিকে ব্যয় হয় ২৬০ কোটির বেশি।
ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে নতুন সংযোজন ও বহুমুখী সেবা
চিঠিপত্রের যুগ ফুরিয়ে যাওয়ায় ডাক বিভাগ নিজেদের আয়ের উৎস বাড়াতে সেবার ধরনে এনেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। ঐতিহ্যবাহী সেবার বাইরে বর্তমানে যেসব সেবা সফলভাবে চালিত হচ্ছে:
- নগদ ও ডিজিটাল সেবা: মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’ থেকে আগে ডাক বিভাগ বছরে ১৪ কোটি টাকার মতো পেলেও গত অর্থবছরে তা বেড়ে ১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
- জরুরি সরকারি নথিপত্র ও ডাক ভোট: পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ভূমির খতিয়ান বা পর্চা ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সেবা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেশ ও দেশের বাইরে বসবাসকারী ১৫ লাখের বেশি ভোটার ডাকযোগে ভোট দেওয়ার এই অভিনব সুযোগ গ্রহণ করেছেন।
- স্পিড পোস্ট ও আন্তর্জাতিক পার্সেল: চলতি বছরের মার্চে চালু হওয়া স্পিড পোস্টের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পার্সেল সেবাতেও পণ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিযোগিতায় বাধা: পুরোনো অবকাঠামো ও জনবল সংকট
বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো যেখানে দ্রুত ডেলিভারি, রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং এবং ঘরে বসে পিকআপের সুবিধা দিচ্ছে, সেখানে ডাক বিভাগের অনেক কার্যক্রম এখনও পুরোনো অবকাঠামো ও জনবলের সীমাবদ্ধতায় আটকে আছে। বিশেষ করে কোল্ড চেইন বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অভাবে পচনশীল ফল বা খাদ্যপণ্য পরিবহনে এখনো ঝুঁকি থেকে যায়।
নতুন উদ্যোগ: ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস
খরচ কমানো এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গত ২৯ জুলাই থেকে চালু করা হয়েছে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস ও পোস্ট পিকআপ পয়েন্ট’। ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনাসহ ১২টি অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে চালিত এই ব্যবস্থায় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চুক্তির ভিত্তিতে ডাকঘরের সেবা দিতে পারবে। পর্যায়ক্রমে এটি গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ভবিষ্যতের ভাবনা: ‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এবারের বিশ্ব ডাক দিবস ও সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, ডাক বিভাগ এখন প্রথাগত ব্যবস্থার বাইরে একটি আধুনিক নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় সংকোচন এবং জনবলকে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।