শাপলা চত্বরের সেই কালরাত: ৩২ খুনের দগদগে ক্ষত নিয়ে ট্রাইব্যুনালে ফিরছে বিচার
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
সময়টা ২০১৩ সালের ৫ মে। ঘড়ির কাঁটা তখন মধ্যরাত ছুঁইছুঁই। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে লাখো মানুষের জমায়েত, আকাশে বারুদের গন্ধ আর চারদিকে এক থমথমে নিস্তব্ধতা। এরপরের ইতিহাস কেবল আর্তনাদ, রক্ত আর চিরতরে হারিয়ে যাওয়া কিছু প্রাণের। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ধামাচাপা পড়ে থাকা সেই বিভীষিকাময় রাতের বিচারিক সত্য এবার সামনে আসতে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম (যিনি বর্তমান তদন্ত প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে রয়েছেন) জানিয়েছেন, সেই রাতের অভিযানে শুধু ঢাকাতেই অন্তত ৩২ জনকে হত্যার সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ হাতে পেয়েছে প্রসিকিউশন টিম। রোববার (৩ মে) ট্রাইব্যুনাল কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।
অপারেশন ‘ফ্লাশ আউট’ ও পরবর্তী রক্তাক্ত অধ্যায়
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক লোমহর্ষক চিত্র। সেদিন সন্ধ্যার পর থেকেই যখন পুরো মতিঝিল এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, তখন চারদিকে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। সেই অন্ধকারে আধুনিক মরণাস্ত্রের গর্জন আর সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে রাজধানী। হেফাজত ইসলামের নেতা মাওলানা আজিজুল হক, জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষ থেকে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল।
প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, এই তদন্ত কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নেই। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতদের পরিবার এবং সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এই ৩২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, "আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নথিপত্র সাজাচ্ছি। আগামী ৭ জুনের মধ্যে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার লক্ষ্য নিয়ে আমাদের টিম কাজ করছে।"
আসামির তালিকায় প্রভাবশালী ২১ মুখ
এই মামলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে অভিযুক্তদের তালিকার কারণে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন সরকারের ২১ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, সেদিন অভিযানে নিয়োজিত বাহিনীর অতি-উৎসাহী কিছু কর্মকাণ্ডের পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল।
এর আগে গত ৫ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন প্যানেল তদন্তের জন্য বাড়তি দুই মাস সময় দিয়েছিলেন। প্রসিকিউশন বলছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তারা একটি নিচ্ছিদ্র প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন যা ইতিহাসের কলঙ্কময় এই অধ্যায়ের প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করবে।
বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষা
শাপলা চত্বরের ঘটনার পর থেকেই নিহতের সংখ্যা নিয়ে নানা বিতর্ক আর ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছিল। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের সংখ্যা নগণ্য দাবি করা হলেও, মানবাধিকার সংগঠনগুলো বরাবরই ভিন্ন দাবি করে আসছিল। দীর্ঘ ১২ বছর পর ট্রাইব্যুনালের এই প্রাথমিক তথ্য কেবল ৩২টি প্রাণের হিসাব দিচ্ছে না, বরং সেই রাতের নিভৃত কান্নার এক দাপ্তরিক স্বীকৃতিও দিচ্ছে।
অপেক্ষার প্রহর এখন ৭ জুনের দিকে, যখন জমা পড়বে সেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন। শাপলা চত্বরের সেই রক্তাক্ত পিচ ঢালা রাস্তা থেকে ট্রাইব্যুনালের এজলাস পর্যন্ত পৌঁছাতে যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, তার সফল সমাপ্তি এখন সময়ের দাবি। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন কেবল একটিই উত্তর খুঁজছে—সেই রাতে কেন ঝরল এই ৩২টি প্রাণ?